জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির শঙ্কা

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির শঙ্কা
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়বে, সঙ্গে বাজারে সবকিছুর দামও বাড়বে। কিন্তু আমাদের আয়তো বাড়ছে না। মাসের খরচ কীভাবে সামলাব, সেটাই এখন চিন্তার বিষয়।’

মেট্রোরেলের একটি ট্রেনে বসে এভাবেই জ্বালানি তেলের নতুন দাম নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছিলেন মতিঝিলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মানিক ইসলাম। তার মতো এদেশের অধিকাংশ মানুষের আয় বাড়ছে না, তাই কেবল জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি তাদের দৈনন্দিন খরচ কয়েকগুণ বাড়াবে। যা আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি করবে। মানিক ইসলামের এই ভাবনাকে অর্থনীতির ভাষায় বলে ব্যয়-বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতি। অর্থাৎ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বা টাকার মান কমে যাওয়া।

গত ২০ সেপ্টেম্বর হঠাৎ করেই ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দাম একলাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। কেরোসিনের দামও বেড়েছে। এতে প্রথমবারের মতো দেশে পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ১৫০ টাকা ছাড়িয়েছে। ২০২২ সালের আগস্টের পর একবারে জ্বালানি তেলের দাম এতটা বাড়ানো হয়নি।

অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেই তার ধাক্কা পৌঁছে যায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। প্রথমে বাড়ে পরিবহন ব্যয়। এরপর পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিত্যপণ্যের দামেও চাপ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত বাড়তি ব্যয়ের বোঝা পড়ে ভোক্তার ওপর। এবারও জ্বালানি তেলের বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির পর মানুষের আয়-ব্যয়ের ফারাক বেড়ে যাওয়ায় উচ্চ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর এই উদ্বেগের বড় কারণ হলো, দেশে মূল্যস্ফীতি এখনো স্বস্তির পর্যায়ে ফেরেনি। এর মধ্যেই জ্বালানি তেলের মূল্য একলাফে অনেক বাড়ানো হয়েছে। ফলে আয় না বাড়লে গরিব, সীমিত আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্তের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

২০২২-এর মূল্যস্ফীতির ধাক্কা এখনো চলছে

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সম্পর্কের বড় উদাহরণ ২০২২ সালের আগস্ট। ওই বছরের ৬ আগস্ট ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম একলাফে বাড়ানো হয়। ৭ আগস্ট থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়। তখন ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করা হয়েছিল। পেট্রলের দাম ৮৬ থেকে ১৩০ টাকা এবং অকটেনের দাম ৮৯ থেকে ১৩৫ টাকা করা হয়। ওই সময় দেশে প্রথমবারের মতো পেট্রল ও অকটেনের দাম ১০০ টাকা ছাড়ায়।

দাম বাড়ানোর আগের মাস জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ, আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে। অর্থাৎ এক মাসেই মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল দুই শতাংশের বেশি। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়া এবং নিত্যপণ্যের দামে ঊর্ধ্বমুখী চাপ- সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়।

পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয়, জাহাজভাড়া, ডলার–সংকটসহ আরও নানা কারণ যুক্ত হয়। ফলে ২০২২ সালের আগস্টের পর মূল্যস্ফীতি আর সাড়ে ৭ শতাংশের নিচে নামেনি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তা ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছিল। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ওই মাসে ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে সার্বিক মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।

এবার মূল্যস্ফীতির চাপ পড়বে যেভাবে

নতুন করে তেলের দাম বাড়ায় প্রথমেই পরিবহন ব্যয় বাড়ার চিত্রটি পুরোনো। আর সেই বাড়তি পরিবহন ব্যয় যুক্ত হবে পণ্যের দামে। উৎপাদন থেকে পাইকারি বাজার, সেখান থেকে খুচরা বাজার—প্রতিটি পর্যায়ে খরচ বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।

তাছাড়া অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন–ভাতা বাড়ানো হয়েছে। আগামী অক্টোবর থেকে তাঁরা নতুন বেতন পাওয়া শুরু করবেন। এতে তাঁদের ব্যয় করার সক্ষমতা বাড়তে পারে।

অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার কমিয়েছে। ঋণের সুদের হার কমলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ার সুযোগ রয়েছে। অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ একদিকে জ্বালানি ব্যয়ের ধাক্কা, অন্যদিকে অর্থের প্রবাহ বাড়ার সম্ভাবনা—দুই দিক থেকেই মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’

জ্বালানি তেলের বড় মূল্যবৃদ্ধিকে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ বলে মনে করছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি। তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি আগের থেকেই বেড়ে আছে। এর সঙ্গে যদি আরও যুক্ত হয় সেটা জনগণের জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। সরকার যদি কার্যকর ভাবে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ না করতে পারে, সেটি সরকারের জন্যও একটি বড় দায়।’

জ্বালানি আমদানির দীর্ঘ মেয়াদি বিকল্প বের করা জরুরি উল্লেখ করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বৈশ্বিক নানা কারণে আজ আন্তর্জাতিক বাজারেও জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। আর বাংলাদেশ জ্বালানিতে পুরোপুরি আমদানি নির্ভর। ফলে কোথাও যুদ্ধ বা সরবরাহ সমস্যা হলে দেশের জনগণকে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। সরকারের জন্যও এটি ভালো না। তাই সরকারকে আমদানির বিকল্প বের করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মনোযোগ দিতে হবে। কীভাবে এখাতে সফল হওয়া যায় তা ভাবতে হবে।‘

সরকারকে সতর্ক করে ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বাজারে পণ্যের দাম বাড়বে। তবে এই সুযোগে ব্যবসায়ীরা যেন অতিরিক্ত মুনাফা করতে না পারেন, সেদিকে নজর রাখতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতিতে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া যায় কি না, সেটিও বিবেচনা করা যেতে পারে।’

/বিবি/