শিরোনাম

প্রণোদনা বাস্তবায়নে ধীরগতি, দুশ্চিন্তায় উদ্যোক্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রণোদনা বাস্তবায়নে ধীরগতি, দুশ্চিন্তায় উদ্যোক্তা
বাংলাদেশ ব্যাংক। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

দেশের অর্থনীতিতে স্থবিরতা কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের বাস্তবায়ন ধীরগতিতে এগোচ্ছে। একই অবস্থা সাম্প্রতিক সময়ে ঘোষিত বিভিন্ন নীতিসহায়তার ক্ষেত্রেও। এরই মধ্যে নীতিসহায়তা পেতে মামলা প্রত্যাহারের নতুন শর্ত যুক্ত হওয়ায় উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

গত ২৩ মে অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার ১৫টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, এই প্যাকেজের ৪১ হাজার কোটি টাকা তফসিলি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে পুনঃঅর্থায়ন তহবিলে দেওয়া হবে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা আসবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে। প্যাকেজগুলো বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির প্রত্যাশা করা হয়েছিলো।

ঘোষণার পর গত দুই মাসে প্যাকেজগুলোর বিস্তারিত নীতিমালা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে বাস্তবায়নের গতি প্রত্যাশার তুলনায় কম বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

শুধু প্রণোদনা নয়, খেলাপি ঋণ কমাতে ঘোষিত বিশেষ পুনঃতফসিল ও এক্সিট সুবিধা নিয়েও তৈরি হয়েছে জটিলতা।

গত ২৯ জুলাই জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, কোনো প্রণোদনা প্যাকেজ বা নীতিসহায়তা পেতে হলে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে দায়ের করা রিটসহ সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। পাশাপাশি আবেদনকারীকে হলফনামায় ঘোষণা দিতে হবে যে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তার কোনো মামলা চলমান নেই।

ব্যবসায়ীদের একটি অংশ মনে করছে, এ শর্ত নীতিসহায়তা বাস্তবায়নের পথ আরও কঠিন করে তুলতে পারে। মামলা প্রত্যাহারের পর কোনো উদ্যোক্তা নীতিসহায়তা না পেলে তিনি আরও আর্থিক সংকটে পড়বেন।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, নতুন শর্তটি নিয়ে সদস্য উদ্যোক্তারা উদ্বিগ্ন। মামলা প্রত্যাহারের পর নীতিসহায়তা না পেলে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তার খেলাপি হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ বিষয়ে গভর্নরের কাছে চিঠি দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সংগঠনটি।

তিনি বলেন, নীতিসহায়তার আবেদন ও মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত সমান্তরালভাবে হওয়া উচিত। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পর্ষদে নীতিসহায়তার আবেদন অনুমোদনের পর তা কার্যকর হওয়ার আগে মামলা প্রত্যাহারের কপি জমা দেয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

অন্যদিকে ব্যাংকাররা বলছেন, মামলা চালিয়ে একই সঙ্গে নীতিসহায়তা চাওয়া বাস্তবসম্মত নয়।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন বলেন, নীতিসহায়তা নিতে হলে গ্রাহককে মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। এতে মামলাজট কমার পাশাপাশি ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণও কমবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রণোদনা ও নীতিসহায়তা বাস্তবায়নের গতি কিছুটা ধীর। তবে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য দেওয়া প্যাকেজগুলোর বাস্তবায়ন তুলনামূলক ভালো। তবে এক্সিট পলিসি ও বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা বাধ্যতামূলক নয়।

এদিকে, দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ খরায় বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহও তলানিতে ঠেকেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

বিনিয়োগ কমার প্রভাব পড়েছে জিডিপির অনুপাতেও দেখা গেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপি-বিনিয়োগ অনুপাত ছিল ৩০ দশমিক ৯৫ শতাংশ। যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নেমেছে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে। একই সময়ে জিডিপির সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগের অনুপাত ২৪ দশমিক ১৮ শতাংশ থেকে কমে ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

ফলে অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ঘোষিত বড় অঙ্কের প্রণোদনা দ্রুত বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

/এসবি/