রাজস্ব কম, বিনিয়োগ স্থবির– ভরসা শুধু ঋণে

রাজস্ব কম, বিনিয়োগ স্থবির– ভরসা শুধু ঋণে
নিজস্ব প্রতিবেদক

একদিকে রাজস্ব ঘাটতি, অন্যদিকে স্থবির বিনিয়োগ। অর্থনীতির এই সংকট মোকাবিলায় সরকার ঋণকেই একমাত্র বিকল্প হিসেবে দেখছে। বর্তমানে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ঋণ ২২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। সরকারি এই ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ। আজ যে শিশুটি জন্ম নেবে তারও মাথাপিছু ঋণ দাঁড়াবে ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা।
আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে আরও ১২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ চেয়েছে সরকার। বিশ্লেষকরা বলছেন, ঋণের ফাঁদ থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে।
অর্থ বিভাগের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশীয় ঋণ ১২ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণ ৯ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা।
আইএমএফের হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশের ঋণ ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ। সংস্থাটির মূল্যায়নে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের কারণ হিসেবে দুর্বল রাজস্ব আহরণ, সুদের বাড়তি ব্যয় এবং দেশীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা উঠে এসেছে। অন্যদিকে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিতে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া। আলোচ্য সময়ে জিডিপির অনুপাতে ভিয়েতনামের ঋণ ৩২ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ায় ২০ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা জানান, শুধু ঋণের অঙ্কেই নয়, ঋণ শোধের সক্ষমতায়ও সমস্যা রয়েছে। উন্নয়নের নামে যে ঋণ নেওয়া হচ্ছে, সেই ঋণ কতটা উৎপাদন বাড়াচ্ছে, কতটা কর্মসংস্থান তৈরি করছে– এর বিজ্ঞানভিত্তিক মূল্যায়ন নেই। এসব কারণে ঋণের সুদ মেটাতেই বাজেটে চাপ বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সুদ পরিশোধের ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা হয়েছে।
তাদের মতে, ঋণের টাকায় উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় না বাড়লে সামনে ভয়ংকর বিপদ আছে। এর সমাধান ঋণ নেওয়া বন্ধ করা নয়, ঋণের ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা। কর ফাঁকি বন্ধ, করের আওতা বাড়ানো, অপচয়ী প্রকল্প বাদ দেওয়া এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির বিকল্প নেই।
শ্রীলংকা একসময় বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও ঋণ সংকটে পড়েছিল। কিন্তু ঋণ পুনর্গঠন, আর্থিক শৃঙ্খলা ও অর্থনীতিতে সংস্কারের কারণে উত্তরণ হয়েছে। আফ্রিকার দেশ ঘানাও বড় ঋণ সংকটে পড়েছিল। পরে দেশটি ঋণ পুনর্গঠন করে। সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনে।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, সরকারের উচ্চঋণের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করেছে। বিপরীতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে দেশি ও বিদেশি ঋণ নিতে হবে। বিশেষ করে এডিপি বাস্তবায়নে ঋণের ওপর নির্ভরতা বেশি। চলতি বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ৩ লাখ কোটি টাকা। বাজেটের হিসাবে রাজস্ব দিয়ে নিয়মিত ব্যয় মেটানোর পর উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশই ঋণের মাধ্যমে জোগান দিতে হবে।
সরকারি সূত্র বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশি ঋণের সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক ঋণের সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই সুদ পরিশোধে যে অর্থ লাগবে, তা মোট বাজেটের প্রায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
এদিকে রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা নিয়ে বরাবরই উদ্বেগ জানিয়ে আসছে আইএমএফ। সংস্থাটির সবশেষ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সরকারি ঋণ ও বৈদেশিক ঋণ– দুটিই মাঝারি মানের ঝুঁকিতে রয়েছে। একইসঙ্গে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ছে। সংস্থাটি আরও বলেছে, রাজস্ব আয় বাড়ানোই ঋণের চাপ কমানোর অন্যতম প্রধান পথ। এ ছাড়াও আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করা এবং বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, বর্তমানে দেশের ঋণ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তবে এ পরিস্থিতি একদিনে সৃষ্টি হয়নি। আগে যেসব ঋণ নেওয়া হয়েছিল, তা সঠিক কাজে খরচ না করে লুটপাট ও অপচয় করায় এমনটি হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। এটি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে না পারলে দেশ ব্যর্থ রাষ্ট্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে তিনি বলেন, সবার আগে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, আগামী দিনে শুধু উৎপাদনশীল খাত ছাড়া অন্য কোনো খাত যেমন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন পরিশোধে নতুন ঋণ নেওয়া যাবে না। তৃতীয়ত, দুর্নীতি ও অর্থের অপচয় কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে।

একদিকে রাজস্ব ঘাটতি, অন্যদিকে স্থবির বিনিয়োগ। অর্থনীতির এই সংকট মোকাবিলায় সরকার ঋণকেই একমাত্র বিকল্প হিসেবে দেখছে। বর্তমানে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ঋণ ২২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। সরকারি এই ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ। আজ যে শিশুটি জন্ম নেবে তারও মাথাপিছু ঋণ দাঁড়াবে ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা।
আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে আরও ১২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ চেয়েছে সরকার। বিশ্লেষকরা বলছেন, ঋণের ফাঁদ থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে।
অর্থ বিভাগের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশীয় ঋণ ১২ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণ ৯ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা।
আইএমএফের হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশের ঋণ ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ। সংস্থাটির মূল্যায়নে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের কারণ হিসেবে দুর্বল রাজস্ব আহরণ, সুদের বাড়তি ব্যয় এবং দেশীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা উঠে এসেছে। অন্যদিকে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিতে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া। আলোচ্য সময়ে জিডিপির অনুপাতে ভিয়েতনামের ঋণ ৩২ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ায় ২০ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা জানান, শুধু ঋণের অঙ্কেই নয়, ঋণ শোধের সক্ষমতায়ও সমস্যা রয়েছে। উন্নয়নের নামে যে ঋণ নেওয়া হচ্ছে, সেই ঋণ কতটা উৎপাদন বাড়াচ্ছে, কতটা কর্মসংস্থান তৈরি করছে– এর বিজ্ঞানভিত্তিক মূল্যায়ন নেই। এসব কারণে ঋণের সুদ মেটাতেই বাজেটে চাপ বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সুদ পরিশোধের ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা হয়েছে।
তাদের মতে, ঋণের টাকায় উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় না বাড়লে সামনে ভয়ংকর বিপদ আছে। এর সমাধান ঋণ নেওয়া বন্ধ করা নয়, ঋণের ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা। কর ফাঁকি বন্ধ, করের আওতা বাড়ানো, অপচয়ী প্রকল্প বাদ দেওয়া এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির বিকল্প নেই।
শ্রীলংকা একসময় বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও ঋণ সংকটে পড়েছিল। কিন্তু ঋণ পুনর্গঠন, আর্থিক শৃঙ্খলা ও অর্থনীতিতে সংস্কারের কারণে উত্তরণ হয়েছে। আফ্রিকার দেশ ঘানাও বড় ঋণ সংকটে পড়েছিল। পরে দেশটি ঋণ পুনর্গঠন করে। সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনে।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, সরকারের উচ্চঋণের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করেছে। বিপরীতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে দেশি ও বিদেশি ঋণ নিতে হবে। বিশেষ করে এডিপি বাস্তবায়নে ঋণের ওপর নির্ভরতা বেশি। চলতি বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ৩ লাখ কোটি টাকা। বাজেটের হিসাবে রাজস্ব দিয়ে নিয়মিত ব্যয় মেটানোর পর উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশই ঋণের মাধ্যমে জোগান দিতে হবে।
সরকারি সূত্র বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশি ঋণের সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক ঋণের সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই সুদ পরিশোধে যে অর্থ লাগবে, তা মোট বাজেটের প্রায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
এদিকে রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা নিয়ে বরাবরই উদ্বেগ জানিয়ে আসছে আইএমএফ। সংস্থাটির সবশেষ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সরকারি ঋণ ও বৈদেশিক ঋণ– দুটিই মাঝারি মানের ঝুঁকিতে রয়েছে। একইসঙ্গে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ছে। সংস্থাটি আরও বলেছে, রাজস্ব আয় বাড়ানোই ঋণের চাপ কমানোর অন্যতম প্রধান পথ। এ ছাড়াও আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করা এবং বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, বর্তমানে দেশের ঋণ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তবে এ পরিস্থিতি একদিনে সৃষ্টি হয়নি। আগে যেসব ঋণ নেওয়া হয়েছিল, তা সঠিক কাজে খরচ না করে লুটপাট ও অপচয় করায় এমনটি হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। এটি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে না পারলে দেশ ব্যর্থ রাষ্ট্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে তিনি বলেন, সবার আগে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, আগামী দিনে শুধু উৎপাদনশীল খাত ছাড়া অন্য কোনো খাত যেমন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন পরিশোধে নতুন ঋণ নেওয়া যাবে না। তৃতীয়ত, দুর্নীতি ও অর্থের অপচয় কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে।

রাজস্ব কম, বিনিয়োগ স্থবির– ভরসা শুধু ঋণে
নিজস্ব প্রতিবেদক

একদিকে রাজস্ব ঘাটতি, অন্যদিকে স্থবির বিনিয়োগ। অর্থনীতির এই সংকট মোকাবিলায় সরকার ঋণকেই একমাত্র বিকল্প হিসেবে দেখছে। বর্তমানে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ঋণ ২২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। সরকারি এই ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ। আজ যে শিশুটি জন্ম নেবে তারও মাথাপিছু ঋণ দাঁড়াবে ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা।
আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে আরও ১২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ চেয়েছে সরকার। বিশ্লেষকরা বলছেন, ঋণের ফাঁদ থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে।
অর্থ বিভাগের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশীয় ঋণ ১২ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণ ৯ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা।
আইএমএফের হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশের ঋণ ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ। সংস্থাটির মূল্যায়নে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের কারণ হিসেবে দুর্বল রাজস্ব আহরণ, সুদের বাড়তি ব্যয় এবং দেশীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা উঠে এসেছে। অন্যদিকে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিতে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া। আলোচ্য সময়ে জিডিপির অনুপাতে ভিয়েতনামের ঋণ ৩২ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ায় ২০ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা জানান, শুধু ঋণের অঙ্কেই নয়, ঋণ শোধের সক্ষমতায়ও সমস্যা রয়েছে। উন্নয়নের নামে যে ঋণ নেওয়া হচ্ছে, সেই ঋণ কতটা উৎপাদন বাড়াচ্ছে, কতটা কর্মসংস্থান তৈরি করছে– এর বিজ্ঞানভিত্তিক মূল্যায়ন নেই। এসব কারণে ঋণের সুদ মেটাতেই বাজেটে চাপ বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সুদ পরিশোধের ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা হয়েছে।
তাদের মতে, ঋণের টাকায় উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় না বাড়লে সামনে ভয়ংকর বিপদ আছে। এর সমাধান ঋণ নেওয়া বন্ধ করা নয়, ঋণের ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা। কর ফাঁকি বন্ধ, করের আওতা বাড়ানো, অপচয়ী প্রকল্প বাদ দেওয়া এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির বিকল্প নেই।
শ্রীলংকা একসময় বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও ঋণ সংকটে পড়েছিল। কিন্তু ঋণ পুনর্গঠন, আর্থিক শৃঙ্খলা ও অর্থনীতিতে সংস্কারের কারণে উত্তরণ হয়েছে। আফ্রিকার দেশ ঘানাও বড় ঋণ সংকটে পড়েছিল। পরে দেশটি ঋণ পুনর্গঠন করে। সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনে।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, সরকারের উচ্চঋণের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করেছে। বিপরীতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে দেশি ও বিদেশি ঋণ নিতে হবে। বিশেষ করে এডিপি বাস্তবায়নে ঋণের ওপর নির্ভরতা বেশি। চলতি বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ৩ লাখ কোটি টাকা। বাজেটের হিসাবে রাজস্ব দিয়ে নিয়মিত ব্যয় মেটানোর পর উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশই ঋণের মাধ্যমে জোগান দিতে হবে।
সরকারি সূত্র বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশি ঋণের সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক ঋণের সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই সুদ পরিশোধে যে অর্থ লাগবে, তা মোট বাজেটের প্রায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
এদিকে রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা নিয়ে বরাবরই উদ্বেগ জানিয়ে আসছে আইএমএফ। সংস্থাটির সবশেষ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সরকারি ঋণ ও বৈদেশিক ঋণ– দুটিই মাঝারি মানের ঝুঁকিতে রয়েছে। একইসঙ্গে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ছে। সংস্থাটি আরও বলেছে, রাজস্ব আয় বাড়ানোই ঋণের চাপ কমানোর অন্যতম প্রধান পথ। এ ছাড়াও আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করা এবং বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, বর্তমানে দেশের ঋণ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তবে এ পরিস্থিতি একদিনে সৃষ্টি হয়নি। আগে যেসব ঋণ নেওয়া হয়েছিল, তা সঠিক কাজে খরচ না করে লুটপাট ও অপচয় করায় এমনটি হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। এটি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে না পারলে দেশ ব্যর্থ রাষ্ট্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে তিনি বলেন, সবার আগে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, আগামী দিনে শুধু উৎপাদনশীল খাত ছাড়া অন্য কোনো খাত যেমন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন পরিশোধে নতুন ঋণ নেওয়া যাবে না। তৃতীয়ত, দুর্নীতি ও অর্থের অপচয় কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে।

৩ মাসে ২৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার







