‘নুন-পান্তা খেয়েও ছেলের সঙ্গে থাকতে চাই’, মায়ের আকুতি

পাবনা প্রতিনিধি
পাবনা প্রতিনিধি
‘নুন-পান্তা খেয়েও ছেলের সঙ্গে থাকতে চাই’, মায়ের আকুতি
ছেলের গলায় ধরে ইউএনও কার্যালয়ের বারান্দায় কান্না করছেন মা মুন্নি খাতুন। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

‘নুন-পান্তা খেয়েও যদি ছেলের সঙ্গে থাকতে পারি, তাহলে বাকি জীবনটা পার করে দিতে পারবো।’– ছেলের সঙ্গে থাকতে এভাবেই আকুতি করছিলেন পাবনার সাঁথিয়ায় ৫০ বছর বয়সী অসুস্থ ও অসহায় মা মুন্নি খাতুন। কিন্তু ভরণপোষণ দিতে রাজি হলেও মাকে নিজের কাছে রাখতে চান না তার ছেলে সাগর হোসেন (৩০)। এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন ওই মা।

অভিযুক্ত সাগর হোসেন সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের গ্রামপুলিশ সদস্য। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) মায়ের করা অভিযোগের শুনানিতে ইউএনও সেলিম আহমেদের সামনে তিনি বলেন, ‘আমি মাকে সঙ্গে রাখতে পারবো না। স্যার, আপনি বলে দেন, আমি মাকে মাসে কত টাকা দেবো। মাকে আমার সঙ্গে দিলে আমি সুইসাইড করবো।’

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সাঁথিয়া উপজেলার সোনাতলা গ্রামের মৃত সিরাজুল ইসলাম ও মুন্নি খাতুন দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে সাগর ছেলে। তাদের মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। স্বামী মারা যাওয়ার পর বৃদ্ধ বয়সে একমাত্র ছেলের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়েন মুন্নি খাতুন। তবে সাগরের বিয়ের পর থেকেই মায়ের সঙ্গে তার বিরোধ দেখা দেয়। একপর্যায়ে ছেলে মাকে নিয়মিত ভরণপোষণ দেওয়া বন্ধ করে দেন এবং নিজের সঙ্গে রাখতেও অনীহা প্রকাশ করেন।

ভুক্তভোগী মা মু্ন্নী খাতুনের অভিযোগ, ছেলের কাছ থেকে ভরণপোষণ ও আশ্রয় পাওয়ার আশায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে একাধিকবার অভিযোগ করেছেন তিনি। স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হলেও তার অভিযোগের স্থায়ী সুরাহা হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেন তিনি। সেখানে নিজের অসুস্থতা, অসহায়ত্ব এবং ছেলের সঙ্গে থেকে বাকি জীবন পার করার আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরেন মু্ন্নী খাতুন।

ইউএনও কার্যালয়ে ভুক্তভোগী মা মু্ন্নী খাতুনসহ অন্যরা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
ইউএনও কার্যালয়ে ভুক্তভোগী মা মু্ন্নী খাতুনসহ অন্যরা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

বৃহস্পতিবার বিকেলে সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অভিযোগটির শুনানি হয়। এ সময় মা ও ছেলের বক্তব্য শোনেন ইউএনও সেলিম আহমেদ। তিনি সাগরকে মায়ের অসুস্থতা ও বৃদ্ধ বয়সের কথা বিবেচনা করে তাকে নিজের কাছে রেখে দেখাশোনার বিষয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন। মানবিকভাবে সমস্যাটির সমাধান করতেও অনুরোধ জানান।

তবে মাকে নিজের সঙ্গে রাখার বিষয়ে অনড় থাকেন সাগর। একপর্যায়ে তিনি মাকে সঙ্গে দিলে আত্মহত্যা করবেন বলেও জানান। পরে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে ছেলেকে কয়েক দিনের সময় দেন ইউএনও। এ সময়ের মধ্যে মায়ের ভরণপোষণ ও দেখাশোনার বিষয়ে সমাধানে আসতে বলা হয়। অন্যথায় পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়।

এ বিষয়ে মা মুন্নি খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী অনেক আগেই মারা গেছে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। আমি অসুস্থ মানুষ, হার্টের রোগী। এখন আমার ছেলে ছাড়া আর কে আছে? আমি ছেলের কাছে টাকা-পয়সা চাই না। নুন-পান্তা খেয়েও যদি ছেলের সঙ্গে থাকতে পারি, তাহলে বাকি জীবনটা পার করে দিতে পারবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি তো মায়ের অধিকার নিয়ে ছেলের ঘরে থাকতে চাই। শেষ বয়সে সন্তানের কাছে একটু আশ্রয় চাইছি। এর বেশি আমার কোনো চাওয়া নেই।’

জানতে চাইলে নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘মা-ছেলের বিষয়টি শুরু থেকেই আমি সমাধানের চেষ্টা করেছি। তবে কোনো কিছুতেই রাজি হন না ছেলে। আমরা স্থানীয়রা সমস্যাটি সমাধানে ব্যর্থ হয়েছি। পরবর্তীতে তার মা ইউএনওর কাছে অভিযোগ করেন।’

এ বিষয়ে সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর উভয় পক্ষকে ডেকে শুনানি করা হয়েছে। একজন বৃদ্ধ ও অসুস্থ মা তার সন্তানের কাছে আশ্রয় ও ভরণপোষণ প্রত্যাশা করছেন। আমরা ছেলেকে বিষয়টি মানবিকভাবে দেখার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করেছি। তাকে কয়েকদিনের সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিষয়টি কীভাবে সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

/এফআর/