শিরোনাম

৯ কোটির সমীক্ষা বিফলে, বাস্তবায়ন হয়নি ঢামেকের ‘স্বপ্নস্বাক্ষর’ প্রকল্প

শেখ শাহরিয়ার হোসেন
শেখ শাহরিয়ার হোসেন
৯ কোটির সমীক্ষা বিফলে, বাস্তবায়ন হয়নি ঢামেকের ‘স্বপ্নস্বাক্ষর’ প্রকল্প
ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

দেশের মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক)। হাসপাতালটিকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ হাজার শয্যায় রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এ প্রকল্পের অংশ হিসেবে হাসপাতালটির অবকাঠামো ও চিকিৎসা সরঞ্জামের চাহিদা নিরূপণে একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) পরিচালনা করা হয়।

‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ ও পুনর্নির্মাণের জন্য ব্যয় প্রাক্কলনসহ মহাপরিকল্পনা ও ডিজাইন প্রণয়ন’ শীর্ষক এ সমীক্ষা প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রায় ৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। প্রকৌশল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘দি প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েট লিমিটেড’ সমীক্ষা, মহাপরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়নের কাজটি সম্পন্ন করে। তবে বিপুল অর্থ ব্যয়ে সমীক্ষা ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলেও শেষ পর্যন্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়ায় ‘স্বপ্নস্বাক্ষর’ প্রকল্পটি আর বাস্তবায়নের পর্যায়ে এগোয়নি। বিপুল অর্থ ব্যয়ে সমীক্ষা হলেও প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়ায় সমীক্ষার ফলপ্রসূতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় পরিসরের ওই প্রকল্পের পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ঝুলে থাকায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নও পিছিয়ে যায়। পুরোনো একাডেমিক ভবন, ঝুঁকিপূর্ণ ছাত্রাবাস ও আবাসন সংকট নিরসনে ছোট পরিসরে কোনো কার্যকর উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। ফলে কয়েক বছর পরও ঢামেকের অবকাঠামোগত সংকট ও হাসপাতালের বেড সংকট কাটেনি। বরং পুরোনো ভবন ও হোস্টেলগুলোর অবস্থা আরও নাজুক হয়েছে।

জানা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সম্প্রসারণে পাঁচ হাজার শয্যা ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংযোজনের পরিকল্পনা নিয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) করা হয়েছিল। প্রকল্পটির জন্য চীনের অর্থায়ন পাওয়ার লক্ষ্যে প্রস্তাবও পাঠানো হয়। তবে পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকল্পটি নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে এত বড় হাসপাতাল নির্মাণে রোগীর চাপ বৃদ্ধি, যানজটের অবনতি এবং প্রয়োজনীয় জায়গা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি না এসব বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রয়োজনীয় বিদেশি অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়ায় প্রকল্পটি আর বাস্তবায়নের পর্যায়ে যেতে পারেনি। চব্বিশের অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর প্রকল্পটি আর না এগোনোর ফলে বর্তমানে হাসপাতালটিকে ৪ হাজার শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কর্তৃপক্ষ। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ডা. আফরিনা মাহমুদ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেলকে এক্সটেনশন করার জন্য পাঁচ হাজার বেড ও মেডিকেল ইকুইপমেন্টের জন্য একটি ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এটি নিয়ে অনেক প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে এত বড় হাসপাতাল হলে রোগী ও সাধারণ মানুষের চাপ বাড়বে, ট্রাফিক পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে এবং প্রয়োজনীয় জায়গা পাওয়া যাবে কি না এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।’

তিনি বলেন, ‘চীন থেকে ফান্ডিং আনার জন্য প্রপোজাল পাঠানো হয়। তবে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য পরে অর্থায়ন পাওয়া যায়নি। মূলত ফান্ডিংয়ের অভাবে ও বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখেনি।’

ডা. আফরিনা মাহমুদ বলেন, এসব প্রশ্ন ও বাস্তবতা বিবেচনায় প্রকল্পের শয্যাসংখ্যা বর্তমান সরকার পাঁচ হাজার থেকে কমিয়ে চার হাজার করার চিন্তা করে। কারণ হিসেবে জানানো হয় ঢাকা মেডিকেল একটি একাডেমিক হাসপাতাল। শুধু বেড বাড়ালেই রোগীর চাপ কমবে এমন নিশ্চয়তা নেই। ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ডিএমসি) ব্যবহার অনুপযোগী স্থাপনাসমূহ প্রতিস্থাপন ও পুনর্নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় এসংক্রান্ত নতুন একটি উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

ঢামেকের পাঁচ হাজার শয্যার সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হওয়ায় ফিজিবিলিটি স্টাডির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো বড় প্রকল্পের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে সমীক্ষা শেষে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত না হলে এবং পরিকল্পনা দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকলে জনঅর্থ ব্যয়ের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এ অবস্থায় ঢামেকের দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট নিরসনে নতুন প্রকল্পটি কত দ্রুত অনুমোদন পায় এবং বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা।

/এসবি/