সিগন্যালেই তাদের স্কুল, ফুটপাতেই ঘর!

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
সিগন্যালেই তাদের স্কুল, ফুটপাতেই ঘর!
ফুল বিক্রি করছে দুই শিশু

যে বয়সে বই-খাতা হাতে স্কুলে যাওয়ার কথা, সে বয়সেই অনেক শিশু ছুটছে গাড়ির জানালায়। খাবার, আশ্রয় আর নিরাপত্তার সন্ধানে রাস্তাই হয়ে উঠেছে তাদের জীবন। প্রতিদিনের এই দৃশ্য নগরবাসীর কাছে এতটাই পরিচিত যে অনেক সময় চোখেই পড়ে না। অথচ এই দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি বড় প্রশ্ন-কেন শিশুর শৈশব কাটছে রাস্তায়?

‘পথশিশু’ শব্দটি দিয়ে সব শিশুর বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। কেউ দিনের বেলায় রাস্তায় কাজ করলেও রাতে পরিবারের কাছে ফেরে। কেউ থাকে অস্থায়ী আশ্রয়ে। আবার কেউ দীর্ঘদিন ধরেই রাস্তাকেই নিজের বসবাস ও জীবিকার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করছে। এই ভিন্নতার কারণে তাদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ এবং একটি সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা তৈরি করাও কঠিন।

২ অক্টোবর জাতীয় পথশিশু দিবস। পথশিশু বা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অধিকার সুরক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশে প্রতি বছর এদিন দিবসটি পালন করা হয়।

গবেষকদের মতে, পথশিশুদের রাস্তায় আসার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন, অবহেলা, নির্যাতন কিংবা পরিবারের অর্থনৈতিক প্রয়োজন-সবই কোনো শিশুকে রাস্তায় ঠেলে দিতে পারে। তাই তাদের শুধু ভিক্ষুক বা অপরাধপ্রবণ শিশু হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা সম্ভব নয়।

রাস্তায় থাকা শিশুর কাছে ফুটপাত কিংবা সড়ক কেবল চলাচলের জায়গা নয়। সেটিই তার কর্মস্থল, খাবারের উৎস, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের জায়গা এবং অনেক ক্ষেত্রে রাত কাটানোর আশ্রয়। ফলে তার জীবনযাপনও নিয়ন্ত্রিত হয় তাৎক্ষণিক প্রয়োজন দিয়ে।

সম্প্রতি জার্নাল অফ হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড সোশ্যাল ওয়ার্ক-এ প্রকাশিত ‘পথশিশু: তাদের জানা ও বোঝা’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিকূলতার মধ্যেও রাস্তায় থাকা শিশুরা নিজেদের টিকে থাকার নানা কৌশল তৈরি করে। তারা জানে কোথায় মানুষের ভিড় বেশি, কোথায় কাজ বা সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও নির্ভরতার সম্পর্কও গড়ে ওঠে। তবে এই সম্পর্ক সবসময় নিরাপদ নয়। নিরাপত্তা বা আশ্রয়ের বিনিময়ে কিছু শিশু চুরি, অবৈধ পণ্য বিক্রি কিংবা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে।

এছাড়াও, মাদক ও ক্ষতিকর দ্রব্য ব্যবহারের ঝুঁকিও রয়েছে। ক্ষুধা, ভয়, ঠান্ডা ও হতাশা থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে কেউ কেউ এসব ব্যবহার করলেও এতে তৈরি হতে পারে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি।

তাই শুধু অভিযান চালিয়ে শিশুদের রাস্তা থেকে সরিয়ে নেওয়া স্থায়ী সমাধান নয়। পরিবারের আয়-রোজগার, খাদ্যনিরাপত্তা, পারিবারিক সহিংসতা, শিক্ষা এবং নিরাপদ আবাসনের মতো মূল সমস্যাগুলো সমাধান না হলে অনেক শিশুই আবার রাস্তায় ফিরে আসতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পথশিশুদের জন্য শিক্ষা, খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিং এবং নিরাপদ আবাসনের সুযোগ একসঙ্গে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শুধু স্কুলে ভর্তি করানোই যথেষ্ট নয়। শিশুটির বাস্তব জীবন ও প্রয়োজনের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থাকে মানিয়ে নেওয়াও জরুরি। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শিশুদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ যে শিশু প্রতিদিন শহরের ফুটপাত, সিগন্যাল আর মানুষের আচরণ দেখে বড় হচ্ছে, সে শহরকে খুব কাছ থেকে চেনে। কোন জায়গায় খাবার মেলে, কোথায় রাতটা নিরাপদ, কে সাহায্য করে আর কে তাড়িয়ে দেয়-এসব তার জীবনের অর্জিত জ্ঞান।

তারা বলেন, কোনো শিশুর বেঁচে থাকার জন্য এমন জ্ঞান অর্জন করার কথা নয়। একটি শিশুর প্রাপ্য হওয়া উচিত নিরাপদ পরিবার, শিক্ষা, খাবার, আশ্রয় এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। পথশিশুকে শুধু রাস্তা থেকে সরিয়ে নয়, তাকে রাস্তায় আসতে বাধ্য করা কারণগুলো দূর করেই সমাধানের পথ তৈরি করতে হবে।

/এসবি/