৩০ টাকার ডাব যেভাবে ঢাকায় এসে হয়ে যায় ২০০ টাকা

৩০ টাকার ডাব যেভাবে ঢাকায় এসে হয়ে যায় ২০০ টাকা
ঢাকার সদরঘাটে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলো থেকে আসা ডাব লঞ্চ থেকে নৌকায় নামানো হয়েছে। এগুলো সরবরাহ করা হবে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

কয়েক দিন আগে রাজধানীর ডাবের একটি দোকানে দেখা হয় সুজন মিয়ার সঙ্গে। তার বাড়ি ভোলায়। এক স্বজনকে নিয়ে তিনি এসেছেন ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে। তার স্বজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। চিকিৎসক বলেছেন, বেশি বেশি ডাবের পানি পান করতে হবে। কিন্তু ডাবের দোকানে গিয়ে হতাশ সুজন মিয়া। যে ডাব তিনি এলাকায় ৩০-৪০ টাকায় কেনেন, সেটার দামই এখানে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা চাচ্ছে খুচরা বিক্রেতা। এই প্রতিবেদক কাছে যেতেই সুজন মিয়া হতাশা নিয়ে বললেন, ‘ডাক্তার বলেছে রোগীকে ডাবের পানি খাওয়ানোর জন্য। আমরাও জানি, ডেঙ্গু রোগীর জন্য ডাব উপকারী। তাই দুইটা ডাব নিলাম। দোকানদার ৩০০ টাকা নিয়েছে। দাম বেশি, তবুও নিতে হলো। জানি না, এভাবে কতদিন কয়টা ডাব খাওয়াতে পারব।’

সুজন মিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকা থেকে ৩০ টাকার ডাব ঢাকায় এসে কীভাবে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা হয়ে যায়, সে ব্যাপারে খোঁজ নিতে মাঠে নেমে যান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের এই প্রতিবেদক।

রাজধানীর সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী পাইকারি ফলের বাজার (আড়ত) বাদামতলী। সেখানে অন্যান্য ফলের সঙ্গে ডাবও বিক্রি হয়। ডাবের চড়া দামের বিষয়ে অনুসন্ধান চালাতে সম্প্রতি বাদামতলীতে যায় এই প্রতিনিধি। তবে সেখানে যাওয়ার আগে সদরঘাটে ভোলার লালমোহন উপজেলার বাসিন্দা সোহাগের সঙ্গে দেখা হয়।। তিনি জানান, তাদের বাড়িতে ত্রিশটি নারকেল গাছ আছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে এলাকার ব্যাপারীর কাছে প্রতিটি ডাব তারা ৩০ টাকা করে বিক্রি করেছেন।

শুধু ভোলা নয় দক্ষিণাঞ্চলের পটুয়াখালী, বরিশাল ও ঝালকাঠির নারকেল গাছ মালিকেরা সোহাগের মতো এই দরেই ডাব বিক্রি করেন। ৩০ টাকার সেই ডাবই বিভিন্ন হাত ঘুরে ঢাকায় এসে খুচরা বাজারে বিক্রি হয় ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়। চলতি বছর সারা দেশে ব্যাপক হারে ডেঙ্গু রোগী বৃদ্ধি পাওয়ায় ডাবের চাহিদা বেড়ে গেছে। অতিরিক্ত এই চাহিদারই সুযোগ নিচ্ছে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী।

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার আরিফ নামের এক পাইকারি ডাব ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা রাঙ্গাবালী থেকে ডাব কিনে আনছি। সেখানে ছোট-বড় মিলে গড়ে ৩০ টাকা করে ডাব কিনলেও ঢাকায় আনতে অনেক খরচ আছে। গাছ থেকে ডাব নামানোর শ্রমিক খরচ, ভ্যানে পরিবহন ইত্যাদি মিলিয়ে ঢাকা পর্যন্ত আনতে ডাবপ্রতি গড়ে ৮০ থেকে ৯০ টাকা খরচ পড়ে। আমরা আড়তে নিয়ে বর্তমানে বড় আকারের ডাব ১২০ টাকা পিচ হিসাবে বিক্রি করি। ছোট ও মাঝারি আকারের ডাব বিক্রি হয় ৮০ থেকে ৯০ টাকায়।’

নারকেল গাছের মালিক ও কয়েকজন ডাব ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে বাদামতলী ফলের আড়তে যান এই প্রতিবেদক। সেখানকার ডাবের আড়তদার মো. রাসেলের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘ডাবগুলো বরিশাল থেকে লঞ্চে আসে। আমরা প্রতি পিচ ডাব কিনি ৮০ থেকে ১৫০ টাকা দিয়ে। আমরা যাদের কাছ থেকে কিনি, তারা কিনে আনেন ৬০ থেকে ৮০ টাকায়।’

বাদামতলীর আরেক আড়তদার ফারুক হোসেন বলেন, ‘বরিশাল থেকে ব্যাপারীরা লঞ্চে ডাব পাঠিয়ে দেয়। আমরা এখানে বিক্রি করে কমিশন পাই। তাদের টাকা আগেই পরিশোধ করে দিতে হয়। কাঁচাবাজারে দাম ওঠা-নামা করে। বাজার ভালো থাকলে লাভ ভালো হয়। আবার খারাপ থাকলে কখনো চালান নিয়ে ঘরে ফিরতে কষ্ট হয়।’

আড়তদার বাবুল বলেন, ‘আমাদের এখানে বড় সাইজের ডাব বিক্রি করছি ১৫০ টাকা করে। ছোট সাইজ ৭০-৮০ টাকা পিচ ধরে বিক্রি করছি।’

বাদামতলী থেকে ইসলামপুর খুব একটা দূরে নয়। সেখানে গিয়ে খুচরা ডাব বিক্রেতা সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিনিধি। ডাবের খুচরা মূল্য নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জাানালেন, ‘আমার এখানে ছোট সাইজের ডাব ১২০ টাকা, মাঝারি সাইজেরটা ১৬০ টাকা। বড়গুলো আমরা তেমন একটা কিনতে পারি না।’

ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে ডাবের দোকানে গিয়ে দেখা যায়, এক দম্পতি ডাব কেনার জন্য দোকানদারের সঙ্গে দরদাম করছে। দোকানদার আকার ভেদে ডাবের দাম ১৪০ থেকে ১৮০ টাকা পর্যন্ত চাইছেন। ডাব কিনে চলে যাওয়ার সময় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় তাদের একজনের সঙ্গে। তিনি আফসোস করে বলেন, ‘খবরে শুনি, এসব ডাব নাকি ৭০-৮০ টাকা করে কেনা। কিন্তু এরা বলছে, তারা ১২০ টাকার নিচে কিনতে পারে না। যত চাপ, সব আমাদের সাধারণ মানুষের ওপর।’

ক্রেতার কথা শুনে ওই বিক্রেতাও চুপ থাকতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আমরা আড়ত থেকে বড় সাইজের ডাব কিনে আনি ১৫০ টাকা করে, ছোটগুলো ১২০ টাকা করে। প্রতি পিচ ডাবে আমরা ১০ বা ১৫ টাকা, সর্বোচ্চ ২০ টাকা লাভ করি।’

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সড়কের পাশের একটি দোকানে ডাব বিক্রি করা হচ্ছে। সম্প্রতি তোলা ছবি। সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সড়কের পাশের একটি দোকানে ডাব বিক্রি করা হচ্ছে। সম্প্রতি তোলা ছবি। সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

ঢাকার অন্যতম বড় কারওয়ান বাজারেও একই পরিস্থিতি। খুচরা ডাব ক্রেতা মো. রাকিব হাসান অনেকটা অভিযোগের সুরেই বলেন, ‘এখান থেকে দুইটা ডাব নিলাম, পিচ ১৬০ টাকার নিচে দেবে না। দুইটা নেওয়ার কারণে আমার কাছ থেকে ১০ টাকা কম রাখছে। এই একইরকম ডাব বনানী থেকে কিনতে হয় ২০০ টাকা দিয়ে। আসলে ওরা নিজেদের ইচ্ছেমতো করে ডাবের দাম রাখে।’

কারওয়ান বাজারের ডাবের আড়তদার মো. রানা হোসেন বলেন, ‘আমরা সর্বনিম্ন ৬০ টাকা থেকে ১২০ টাকা দামে ডাব বিক্রি করি। এই ডাবগুলো ব্যাপারীরা নোয়াখালী, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, যশোর ও ভোলা থেকে নিয়ে আসেন। ওইসব জায়গা থেকে আনতে কত টাকা খরচ পড়ে আমরা জানি না। তবে এখানে বিক্রি করে আমরা শতকরা ৬ টাকা কমিশন পাই।’

ডাব কেনবেচায় কমিশনের এই চক্করে আসলে কার লাভ হচ্ছে আর কার লোকসান হচ্ছে-এমন প্রশ্ন করা হয় কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইনের কাছে। তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগী বাড়ার ফলে বাজারে ডাবের চাহিদা বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে প্রতি পিচ ডাবের দাম ১৮০ টাকা বা ২০০ টাকা হওয়া মোটেও উচিত নয়। এতে এক ধরনের অসাধু ব্যবসায়ীরা লাভবান হয়। এখানে খুচরা ও পাইকারি উভয় ব্যবসায়ীই ফায়দা নেয়। কিন্তু কেউ দায় স্বীকার করে না। এতে ক্ষতি হয় সাধারণ ডাব ক্রেতার।’

/বিবি/