ইসরায়েলি হামলার ৩ বছর: চরম মানবিক বিপর্যয়ে গাজাবাসী

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
ইসরায়েলি হামলার ৩ বছর: চরম মানবিক বিপর্যয়ে গাজাবাসী
গাজা সিটির আল-জেইতুন মহল্লায় ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হওয়া বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপ থেকে জিনিসপত্র উদ্ধার করছে ফিলিস্তিনিরা। ছবি: আল জাজিরা

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের নজিরবিহীন হামলায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত এবং ২৫১ জন অপহৃত হওয়ার পর শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ৩ বছর পূর্ণ হলো। এ দীর্ঘ সময়ে ইসরায়েলি বাহিনীর টানা বিমান ও স্থল হামলায় পুরো গাজা উপত্যকা এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন সেখানকার ২০ লাখেরও বেশি মানুষ। বুধবার দক্ষিণ ইসরায়েলের বিভিন্ন সড়ক ও আশ্রয়কেন্দ্রে শোক পালন করেছেন ইসরায়েলিরা।

ফিলিস্তিনিদের কাছে এ বার্ষিকীটি কেবলই যন্ত্রণা আর অন্তহীন অনিশ্চয়তায় ভরা। ইসরায়েলি অভিযানে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে গাজার অধিকাংশ শহর। বাধ্য হয়ে উপত্যকার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষকে বারবার ভিটামাটি ছেড়ে পালাতে হয়েছে। তাদের বড় অংশটিই এখন বসবাস করছেন অস্বাস্থ্যকর তাঁবুতে। প্রয়োজনীয় খাদ্য ও ত্রাণ সরবরাহে কড়াকড়ি থাকায় দেখা দিয়েছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি। গাজার অর্ধেকেরও বেশি এলাকা বর্তমানে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দখলে। প্রায় এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হলেও তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ আছে। অব্যাহত রয়েছে ইসরায়েলি হামলা। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও হামাসকে নিশানা করার অজুহাতে চালানো হামলায় ১ হাজার ১৪৫ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। আর একই সময়ে নিহত হয়েছেন সাতজন ইসরায়েলি সেনা।

ইসরায়েলি হামলা ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি
ইসরায়েলি হামলা ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই তিন বছরে মোট ৭৪ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের প্রায় অর্ধেকই নারী ও শিশু। যদিও এ সরকারের সঙ্গে হামাস যুক্ত, তবুও আন্তর্জাতিক গবেষক ও জাতিসংঘ এ পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য বলেই গণ্য করে। ইসরায়েলের কয়েক দশকের সামরিক দখলদারিত্ব ও অবৈধ বসতি স্থাপনের প্রতিবাদ হিসেবে হামাস এ আক্রমণ চালিয়েছে বলে দাবি করলেও, আজকের বাস্তবতা ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্রগঠনের স্বপ্নকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

এই বার্ষিকীর পটভূমিতে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে চলতি মাসের শেষের দিকে ইসরায়েলে হতে যাওয়া বিতর্কিত নির্বাচন। ৫ অক্টোবর সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক স্মারক সভার আয়োজন করা হলেও সাধারণ মানুষ ও বিরোধীরা আলাদাভাবে শোক পালন করেন। এ বিভাজন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধ পরিচালনা পদ্ধতি এবং ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার ঘটনায় আনুষ্ঠানিক তদন্তে তার অনাগ্রহ নিয়ে ইসরায়েলের ভেতরে তৈরি হওয়া গভীর ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।

ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপের মাঝে বসে আছেন এক নারী
ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপের মাঝে বসে আছেন এক নারী

গাজা সংঘাতের প্রভাবে আজ পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। হামাসের সমর্থনে হিজবুল্লাহর যুদ্ধে যুক্ত হওয়ার পর দক্ষিণ লেবাননের বড় অংশ নিজেদের দখলে নিয়েছে ইসরায়েল, যার ফলে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন ৩ লাখেরও বেশি লেবানিজ। একই সঙ্গে সিরিয়ার বিস্তৃত এলাকাও ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে দুই দফায় ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক কর্মসূচিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা হয়েছে এবং অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। অন্যদিকে, পশ্চিম তীরেও কট্টর-ডানপন্থি সরকারের মদদে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের দৌরাত্ম্য ফিলিস্তিনিদের জীবন ও সম্পত্তিকে প্রতিনিয়ত চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট

/এমএকে/