এক্সপ্লেইনার

ফ্লাইদুবাইয়ের সেই রহস্যময় কো-পাইলট কে

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
ফ্লাইদুবাইয়ের সেই রহস্যময় কো-পাইলট কে
ফ্লাইদুবাইয়ের কো-পাইলট হামাম আল-হামানি

দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বিমানে কো-পাইলটের হাতে ক্যাপ্টেন আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় নতুন কিছু তথ্য সামনে এসেছে। একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ওই কো-পাইলটকে ওমানের নাগরিক হামাম আল-হাম্মামি হিসাবে শনাক্ত করা হয়েছে।

তবে তার পরিচয়, কথিত চরমপন্থী মতাদর্শ এবং হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, তিনি একাই এ ঘটনা ঘটিয়েছেন, নাকি এর সঙ্গে অন্য কারও যোগসূত্র রয়েছে।

৩ অক্টোবর সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেল ঘটনাটিকে ‘সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। এর আগে তদন্তকারীরা হামলার উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য পূর্বপরিকল্পনার বিষয়টিও খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছিলেন।

কে এই হামাম আল-হাম্মামি

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামাম আল-হাম্মামি একজন ওমানের নাগরিক। তার পরিচয় সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন উপসাগরীয় অঞ্চলের একজন কূটনীতিক ও একজন পশ্চিমা কূটনীতিকসহ তিনজন ব্যক্তি। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল-হাম্মামির জন্ম সংযুক্ত আরব আমিরাতে। তার মা সিরিয়ার নাগরিক। জীবনের কয়েক বছর তিনি আমিরাতেই কাটিয়েছেন।

তার আগের বিমান চলাচল-সংক্রান্ত চাকরি নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠেছে। সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, আল-হাম্মামি প্রায় সাত বছর ওমান এয়ারে কাজ করেছেন। তার নামে থাকা একটি লিংকডইন প্রোফাইল অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ওই চাকরি ছাড়েন। একই বছরের জুনে তিনি রয়্যাল এয়ার মরক্কোতে যোগ দেন এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সেখান থেকে চলে যান।

এরপর তিনি ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের বাকিংহামশায়ার নিউ ইউনিভার্সিটি জানিয়েছে, আল-হাম্মামি তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে বিমান চলাচল ব্যবস্থাপনা বিষয়ে দূরশিক্ষণ কোর্স করেছিলেন। তবে সেখানে তিনি পাইলট হিসাবে প্রশিক্ষণ নেননি।

আগে থেকেই কি কোনো সতর্ক সংকেত ছিল

এই ঘটনাকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে আল-হাম্মামির অতীত নিয়ে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, চরমপন্থী মতাদর্শের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার আশঙ্কায় ওমানের কর্তৃপক্ষ একসময় তাকে দেশটিতে বিমান চালানো থেকে নিষিদ্ধ করেছিল।

সিএনএনের একটি প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, একই ধরনের উদ্বেগের কারণে তাকে ফ্লাইট প্রশিক্ষণ থেকে সরিয়ে অন্য দায়িত্বে দেওয়া হয়েছিল।

তবে তার কথিত ওই মতাদর্শ কী ছিল, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ওমানের কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে অন্য কোনো দেশ বা বিমান সংস্থাকে সতর্ক করেছিল কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।

তাই তার অতীতের এসব তথ্যের সঙ্গে বুধবারের হামলার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

ফ্লাইটে সেদিন কী ঘটেছিল

ঘটনাটি ঘটে বুধবার ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 ফ্লাইটে। বিমানটিতে ১৭৪ জন যাত্রী ছিলেন। দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিবের উদ্দেশে উড্ডয়নের পর বিমানটি প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় ওঠে।

ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, উড্ডয়নের দুই ঘণ্টার কিছু সময় পর বিমানটির গতিপথে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে বিমানটি দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। পরে আবার ওপরে ওঠে এবং পুনরায় নিচে নামতে থাকে।

প্রায় দুই মিনিটের মধ্যে বিমানটি ১৭ হাজার ফুটের বেশি নিচে নেমে যায়।

এ সময় ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কো-পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারকে ছুরি দিয়ে আক্রমণ করেন। পরে তিনি ককপিটে থাকা জরুরি ক্র্যাশ অ্যাক্সও ব্যবহার করেন।

আহত ক্যাপ্টেন মাচ্ছার পরে জানান, একপর্যায়ে তিনি ককপিটের মেঝেতে পড়ে যান। বিমানটি দ্রুত নিচে নামছিল বুঝতে পেরে তিনি ককপিটের দরজা খোলার চেষ্টা করেন।

দরজা খোলার পর যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা ককপিটে ঢুকে কো-পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে নেন।

এরপর বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেন সেখানে থাকা দুই রিজার্ভ পাইলট। তারা বিমানটিকে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিয়ে নিরাপদে অবতরণ করান।

বিমানটি তাবুকে অবতরণের পর দুই পাইলটকেই হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসা শেষে তাদের আবুধাবিতে নেওয়া হয়।

বিমানের ট্রান্সপন্ডারে ৭৫০০ কোড কেন দেওয়া হয়েছিল

ঘটনার সময় বিমানের ট্রান্সপন্ডার কোড পরিবর্তন করে ৭৫০০ করা হয়। বিমান চলাচলে এই কোড বেআইনি হস্তক্ষেপ বা হাইজ্যাকিংয়ের মতো গুরুতর পরিস্থিতির সংকেত হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

ফলে বিমানটি যে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ছিল না, সেটি দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সংকেতের মাধ্যমে জানানো সম্ভব হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাত কী বলছে

সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেল হামাদ সাইফ আল-শামসি শনিবার বলেন, তদন্তকারীরা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছেন যে কো-পাইলট ক্যাপ্টেনকে আক্রমণ করে বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, কো-পাইলট ককপিটে থাকা জরুরি ক্র্যাশ অ্যাক্স ব্যবহার করে ক্যাপ্টেনকে আক্রমণ করেন।

এর আগে আল-শামসি তদন্তকারীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, ঘটনাটির সঙ্গে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা কোনো সন্ত্রাসী উদ্দেশ্য জড়িত ছিল কি না তা খুঁজে দেখতে। একই সঙ্গে হামলাটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না এবং এর পেছনে অন্য কেউ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রাখা হয়।

তবে এখনো হামলার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।

আল-শামসি বলেছেন, তদন্তে ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে হামলার উদ্দেশ্য, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্ভাব্য যোগাযোগ এবং ঘটনার আগে ও পরে কী ঘটেছিল, তা নির্ধারণ করা।

তদন্ত এখন কোন পর্যায়ে

ঘটনার তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছে আবুধাবি। তদন্তকারীরা বিমানের প্রযুক্তিগত তথ্য, শারীরিক আলামত এবং ডিজিটাল প্রমাণ পরীক্ষা করছেন।

বিমানটি সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিবন্ধিত এবং দেশটির পতাকাবাহী হওয়ায় দেশটির আইন অনুযায়ী এর বিচারিক এখতিয়ার রয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল।

/এমআর/