চীনের ‘বাণিজ্যিক অস্ত্র’ লগইঙ্ক কেন অচল হয়ে পড়লো

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
চীনের ‘বাণিজ্যিক অস্ত্র’ লগইঙ্ক কেন অচল হয়ে পড়লো
প্রতীকী ছবি

চার বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করে বলেছিল, বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহণের ওপর নজরদারি চালাতে ‘লগইঙ্ক’ নামে একটি ডিজিটাল প্রযুক্তি গড়ে তুলছে চীন। কাগজবিহীন ও সহজ পরিবহণ ব্যবস্থার কথা বলে রাষ্ট্রীয় মদতে তৈরি উদ্যোগটি এখন কার্যত পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। শিপিং খাতের সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকার ও আইনি নথি বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, বিশ্বজুড়ে বড় বড় অংশীদারত্ব হারানোর পাশাপাশি চীনের ভেতরেই আইনি ও আর্থিক সংকটে ভেস্তে গেছে বিশাল প্রকল্পটি।

সম্প্রতি চীনের ওয়েনঝু শহরে লগইঙ্কের মূল কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো দপ্তরটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। ঘরে আলো নেই, অভ্যর্থনা কক্ষ জনশূন্য এবং কম্পিউটারের তারগুলো এলোমেলোভাবে পড়ে আছে। যোগাযোগের কোনো ফোন বা ইমেলেরও জবাব দিচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি।

বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই সম্পন্ন হয় সমুদ্রপথে। আর সামুদ্রিক বাণিজ্যের মূল তথ্য নিয়ন্ত্রণে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বেইজিংয়ের যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল, তাতে লগইঙ্কের পতন চীনের জন্য বড় ধাক্কা। মার্কিন গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ছিল, বাণিজ্য সহজ করার অজুহাতে চীনা কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দিতে এবং ইউক্রেন ও তাইওয়ানে পাঠানো মার্কিন স্পর্শকাতর সামরিক চালানের ওপর নজর রাখতে প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করছিল বেইজিং।

বিষয়টি নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র জানান, বেইজিং নিয়ন্ত্রিত কোনো প্ল্যাটফর্মকে বিশ্বের নৌ-বাণিজ্য সংক্রান্ত তথ্যের ওপর একক আধিপত্য বিস্তার করতে দেবে না ওয়াশিংটন। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের সরকারি দপ্তর ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবকাঠামোতে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছি এবং আমাদের মিত্র দেশ ও সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতকেও আহ্বান জানাচ্ছি যেন তারা এ হুমকিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে।’

চীনের সমুদ্র বন্দর
চীনের সমুদ্র বন্দর

লগইঙ্ক আসলে কী

লগইঙ্কের আনুষ্ঠানিক নাম ‘জাতীয় পরিবহন ও লজিস্টিকস পাবলিক ইনফরমেশন প্ল্যাটফর্ম’। চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশে ছোট আকারে দুই দশক আগে এর যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে চীনের কেন্দ্রীয় পরিবহণ মন্ত্রণালয় এর নিয়ন্ত্রণ নেয়। ২০১০ সালের পরে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং ও ইউরোপের বিভিন্ন বন্দরের তথ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে লগইঙ্ককে যুক্ত করার চুক্তি করে চীন। বেইজিংয়ের লক্ষ্য ছিল সমুদ্রপথে বিশ্বের পণ্য চলাচলের ৯০ শতাংশ ডেটা একক পোর্টালে নিয়ে আসা।

২০২২ সালে বিষয়টি নিয়ে মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়। বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ একাধিক মার্কিন আইনপ্রণেতা জো বাইডেনকে চিঠিতে জানান, এ ব্যবস্থা চীনকে বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের সুযোগ করে দিচ্ছে। এরপরই পেন্টাগনকে নির্দেশ দেওয়া হয় লগইঙ্ক-সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করতে এবং মিত্র দেশগুলোকে এটি ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়ার কথাও বলা হয়।

লগইঙ্কের অফিস
লগইঙ্কের অফিস

কেন হঠাৎ অচল হয়ে পড়ল

মার্কিন কূটনৈতিক চাপ ও আর্থিক সংকটের মুখেই ভেঙে পড়ে লগইঙ্কের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বন্দর বিষয়ক সংস্থায় (আইপিসিএসএ) বার্ষিক ফি দেওয়া বন্ধ করে দেয় প্ল্যাটফর্মটি। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এটি। পাশাপাশি অকার্যকর হয়ে যায় এর নিজস্ব ওয়েবসাইটও।

দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গেও ডেটা আদান-প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে চীন। পূর্বঘোষণা ছাড়াই জাপানের ডেটা অ্যাক্সেস বন্ধ করে দেয় চীন। একইসঙ্গে বাতিল করে আলোচনা পর্বও । অন্যদিকে পর্তুগালের সিনেস বন্দর ও ডাচ সরকারের আপত্তির মুখে ইউরোপের বৃহত্তম রটারডাম বন্দর কর্তৃপক্ষ চীনা প্ল্যাটফর্মটির সঙ্গে সব ধরনের চুক্তি ও আলোচনা স্থগিত করে।

আন্তর্জাতিক ধাক্কার পাশাপাশি চীনেও দেউলিয়া মুখে পড়েছে লগইঙ্ক। বাণিজ্যিক নথি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ওয়েনঝু কেন্দ্রে অন্তত ৩৯টি আইনি মামলা ঝুলে আছে। ঘর ভাড়া না দেওয়া, কর্মীদের বেতন বকেয়া এবং ইউটিলিটি বিল না দেওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে। এমনকি চায়না মোবাইলের একটি স্থানীয় শাখা লগইঙ্কের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে।

একসময় বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খল নিজের কব্জায় নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল বেইজিং। তবে ধুলোমাখা ডেস্ক ও চেয়ারের পাশে থাকা দেয়ালে বড় করে লেখা ছিল কমিউনিস্ট পার্টির একটি স্লোগান, যেখানে ২০৩৫ সালের মধ্যে ‘বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে কাজে লাগানোর’ বিষয়ে চীনের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স

/এমএকে/