দেশের ৮৫ শতাংশ বাসাবাড়ির পানিতে মলের জীবাণু

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
দেশের ৮৫ শতাংশ বাসাবাড়ির পানিতে মলের জীবাণু
ছবি: এআই

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পানির তীব্র সংকট রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবাণু ও দূষণজনিত স্বস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশগত বিপর্যয়। প্রায় ৮৫ শতাংশ পরিবারের ব্যবহারযোগ্য পানিতে মলের জীবাণু ‘ই. কোলাই’ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে মাত্রাতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে উত্তরাঞ্চলের ১৫৩টি ইউনিয়ন ও চট্টগ্রামের পটিয়ায় দেখা দিয়েছে ভূগর্ভস্থ পানির তীব্র সংকট। আর রাজধানীর নদীগুলো দীর্ঘদিন ধরে দূষণের ফলে জীবন ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) ২০২৫’-এর প্রাথমিক ফলে এবং পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) মূল্যায়নে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পানিতে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে ডায়রিয়া, জ্বর, রক্তশূন্যতা ও বমি হতে পারে। এমনকি কিডনি বিকল হওয়ার মতো গুরুতর পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। এত সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে থাকে শিশু ও বয়স্করা।

ইউনিসেফের সার্ভে-২০২৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৯৮.৬ শতাংশ মানুষ অন্তত মৌলিক পানির সুবিধা পেয়ে থাকে। তবে নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত পানির সুবিধা পায় মাত্র ৪২.৬ শতাংশ। সমীক্ষায় দেখা গেছে, পানির উৎসের নমুনায় ই. কোলাই পাওয়া গেছে ৪৭. শতাংশ ক্ষেত্রে। কিন্তু উৎস থেকে সংগ্রহ, পরিবহণ ও সংরক্ষণের ত্রুটির কারণে বাসাবাড়িতে ব্যবহারের সময় তা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৮৪.৯ শতাংশে। দরিদ্র পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এই দূষণের হার আরও বেশি। প্রায় ৯০.৪ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্যা দ্রুত সমাধান করতে না পারলে শিশুদের নিরাপদ বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।

এদিকে নিরাপদ পানির পাশাপাশি দেশের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে তীব্র পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ওয়ারপোর পর্যালোচনা অনুযায়ী রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়ন এবং ৪ হাজার ৯১১টি মৌজার মধ্যে ৪৭টি ইউনিয়ন অতি উচ্চ, ৪০টি উচ্চ এবং ৬৬টি মধ্যম মাত্রার পানি সংকটাপন্ন হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে।

বিভিন্ন কারণে এই তিন জেলার ১৫৩টি ইউনিয়নে তীব্র পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে সেচকাজে ব্যাপক উত্তোলন, ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণ কম হওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অন্যতম।

একইভাবে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ৩টি ইউনিয়ন অতি উচ্চ, ৪টি উচ্চ এবং ৫টি মধ্যম মাত্রার পানি সংকটাপন্ন হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। শিল্পকারখানায় গভীর নলকূপের মাধ্যমে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে এই সংকটের সৃষ্টি।

এদিকে রাজধানী ঢাকার চারপাশে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যার পানির মান পরীক্ষায় দূষণের উদ্বেগজনক চিত্র পেয়েছে ওয়ারপো। চার নদীর ৩৬টি স্থান থেকে চার মৌসুমে পানির নমুনা নিয়ে ১৬টা প্যারামিটার পরীক্ষা করা হয়েছে।

পানির মান নির্ধারণে সাধারণত তাপমাত্রা, পিএইচ, বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা, ঘোলাভাব, মোট কঠিন পদার্থ, মোট দ্রবীভূত কঠিন পদার্থ, মোট ভাসমান কঠিন পদার্থ, দ্রবীভূত অক্সিজেন, জৈব রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা বা বিওডি, রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা বা সিওডি, ক্লোরাইড, টোটাল কলিফর্ম, ই-কোলাই, নাইট্রেট, ফসফেট ও অ্যামোনিয়া পরীক্ষা করা হয়।

ওয়ারপোর সমন্বিত ডব্লিউকিউআই ফলাফলে দেখা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে অধিকাংশ স্থানে পানির মান ‘খারাপ’ পর্যায়ে থাকছে। বর্ষায় মানের কিছুটা উন্নতি হলেও কোনোটাই ‘চমৎকার’ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

গবেষণায় বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) মাত্রা মারাত্মকভাবে কম এবং জৈব রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা (বিওডি) অনেক বেশি পাওয়া গেছে। এর ফলে নদীতে উচ্চমাত্রার জৈব দূষণ ও জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য চরম অক্সিজেন ঘাটতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

চার নদী দূষণের পেছনে শিল্প, বিভিন্ন সংস্থা, সাধারণ মানুষ ও হাটবাজার থেকে নদীতে ফেলা বর্জ্যকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। দূষণের এসব উৎস বন্ধ করতে না পারলে নদীর পানির মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আনা সম্ভব হবে না বলে জানান তারা।

অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে সংকটপূর্ণ এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন কমানো, ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানো এবং পানি পুনঃব্যবহারের নীতি অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

/জেএইচ/