সৌদি-হুথি সংঘাত চলতে থাকলে চাপে পড়বে বাংলাদেশের অর্থনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
সৌদি-হুথি সংঘাত চলতে থাকলে চাপে পড়বে বাংলাদেশের অর্থনীতি
সৌদি আরবের রিয়াদে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে একটি তেল সংরক্ষণাগারে গত ১৯ সেপ্টেম্বর হামলার পর কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। ছবি: রয়টার্স

সৌদি আরবের সঙ্গে ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথিদের সংঘাত পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক শ্রমবাজার। এছাড়া জ্বালানি পণ্য, সার ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশটির ওপর নির্ভর করতে হয়।

সৌদি-হুথি সংঘাতের ভৌগোলিক ক্ষেত্র সুয়েজ খাল ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি হওয়ায় আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহনেও ঝুঁকি রয়েছে। সেক্ষেত্রে আমদানি ও রপ্তানিতে বিঘ্ন এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এরইমধ্যে যুদ্ধের চাপ সৌদি আরবের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বৈশ্বিক ব্যবসায়িক সংযোগে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের একের পর এক হামলার পর শত শত ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলো সৌদি আরবগামী ফ্লাইট কমিয়ে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে সৌদির বিনিয়োগ, নির্মাণ, পর্যটন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে গতি কমতে পারে। সেক্ষেত্রে দেশটিতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির আয় ও কর্মসংস্থানে বড় ধাক্কা আসতে পারে।

সৌদি আরবে বর্তমানে ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। গত ৮ মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২৫ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকেই এসেছে ৪ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এ সময়ে রেমিট্যান্সের প্রায় ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ এসেছে সৌদি আরব থেকে। ফলে দেশটিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা তৈরি হলে এর প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীদের ওপর পড়তে পারে।

দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৬৫-৭০ লাখ টন। এর মধ্যে ১৪-১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি হয়। সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত সৌদি আরামকো থেকে ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড’ আসে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টন। এর বাইরে আবুধাবির অ্যাডনক থেকেও অপরিশোধিত তেল কেনে বাংলাদেশ। এ অপরিশোধিত তেল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধনের মাধ্যমে ডিজেল, বিটুমিন, পেট্রলসহ ১৩ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন হয়।

পরিশোধিত জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশই বাংলাদেশকে আমদানি করতে হয়। ফলে সৌদি-হুথি সংঘাত আঞ্চলিক শিপিং রুট, বীমা ব্যয় বা ফ্রেইট চার্জে চাপ তৈরি করলে বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি আনার খরচ বেড়ে যেতে পারে।

অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সরবরাহকারী দেশের তালিকটি খুবই ছোট। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সরবরাহকারী তালিকায় সৌদি আরামকোর পাশাপাশি আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি বা অ্যাডনক রয়েছে। ফলে সৌদি আরবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হয়ে উৎপাদন, রপ্তানি টার্মিনাল, বন্দর বা আঞ্চলিক নৌপথে বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সময়মতো ক্রুড অয়েল পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

পরিশোধিত জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশই বাংলাদেশকে আমদানি করতে হয়। ফলে সৌদি-হুথি সংঘাত আঞ্চলিক শিপিং রুট, বীমা ব্যয় বা ফ্রেইট চার্জে চাপ তৈরি করলে বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি আনার খরচ বেড়ে যেতে পারে।

সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশের আমদানি করা গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের মধ্যে সারও রয়েছে। দেশটি থেকে ইউরিয়া আমদানি করে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এবং ডিএপি আমদানি করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার পর বাংলাদেশে ইউরিয়া সরবরাহকারী সৌদি প্রতিষ্ঠান স্যাবিক এগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস এ পর্যন্ত দুইবার বন্দর পরিবর্তন করেছে। এখন পর্যন্ত সরবরাহ সচল রয়েছে। তবে আঞ্চলিক সংঘাত আরো বিস্তৃত হলে বিকল্প রুট ব্যবহারের সক্ষমতা কতটা টেকসই থাকবে, সেটি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

বিএডিসি সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে সৌদি আরব থেকে ১১টি লটে ডিএপি আসার কথা রয়েছে। এরইমধ্যে ৫টি লট (২ লাখ টন) দেশে এসেছে। বাকি চালানগুলো আগামী নভেম্বরের শেষ নাগাদ আনার প্রক্রিয়া চলছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএডিসির এক কর্মকর্তা বলেন, এ যুদ্ধ আরো বিস্তৃত হলে আমদানি প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরি হতে পারে।

বিসিআইসির তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে জিটুজি চুক্তির আওতায় মোট ৫ লাখ ২০ হাজার টন ইউরিয়া আমদানির ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ২০ হাজার টন নিশ্চিতভাবে কেনার কথা এবং বাকি ২ লাখ টন ঐচ্ছিক চুক্তির আওতায়। ১৬ ও ২২ অক্টোবর একটি করে মোট দুটি জাহাজ সৌদি আরব থেকে ইউরিয়া নিয়ে দেশে পৌঁছার কথা রয়েছে। নভেম্বরের জন্য আরো দুটি জাহাজের লোডিং প্রক্রিয়া চলছে।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার পর বাংলাদেশে ইউরিয়া সরবরাহকারী সৌদি প্রতিষ্ঠান স্যাবিক এগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস এ পর্যন্ত দুইবার বন্দর পরিবর্তন করেছে। এখন পর্যন্ত সরবরাহ সচল রয়েছে। তবে আঞ্চলিক সংঘাত আরো বিস্তৃত হলে বিকল্প রুট ব্যবহারের সক্ষমতা কতটা টেকসই থাকবে, সেটি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

সৌদি আরবে চলমান সংঘাতে বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা ঝুঁকিও সামনে এসেছে। ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় নিহত ১৩ জনের মধ্যে দুইজন বাংলাদেশি। এছাড়া আহত হন আরো ২৪ বাংলাদেশি। সংঘাত বিস্তৃত হলে দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা ঝুঁকি আরো বাড়বে।

/এফসি/