দিলীপ আগরওয়ালা: ছবি ভাইরালের পর চোরাচালান ও অর্থপাচারের অভিযোগ

দিলীপ আগরওয়ালা: ছবি ভাইরালের পর চোরাচালান ও অর্থপাচারের অভিযোগ
দিলীপ আগরওয়ালা ও তাকে নিয়ে ভাইরাল হওয়া ছবি। কোলাজ: সিজেডএন গ্রাফিক্স

ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে ঘিরে আবারও শুরু হয়েছে আলোচনা। কখনো স্বর্ণ ও হীরা চোরাচালানের অভিযোগ, কখনো অর্থপাচার ও প্রতারণার মামলা, আবার কখনো রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে উপস্থিতি– বিভিন্ন কারণে বারবার আলোচনায় এসেছেন এই ব্যবসায়ী।

সর্বশেষ দুর্গাপূজার একটি অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা তার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে আসেন তিনি। এর একদিন পর রাজধানীর বনানী থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে করা মামলায় আদালত তার একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

একজন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ, গ্রেপ্তার, জামিনে মুক্তি এবং পুনরায় আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ছবি ভাইরাল, এরপর গ্রেপ্তার

দিলীপ আগরওয়ালাকে নিয়ে সর্বশেষ আলোচনার সূত্র দুর্গাপূজার একটি অনুষ্ঠান। সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের পেছনে তার দাঁড়িয়ে থাকা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ছবিটি প্রকাশ করের চুয়াডাঙ্গা জেলা ছাত্রদলের সাবেক নেতা তানজীব সারোয়ার। ফেসবুক পোস্টে তিনি দিলীপ আগরওয়ালার রাজনৈতিক পরিচয় এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

পোস্টটি চুয়াডাঙ্গাসহ আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দীর্ঘ সময় আড়ালে থাকা দিলীপ আগরওয়ালাকে এমন একটি অনুষ্ঠানে দেখা যাওয়ায় কৌতূহল তৈরি হয়।

ফেসবুকে দিলীপ আগরওয়ালাকে নিয়ে তানজীব সারোয়ারের পোস্ট
ফেসবুকে দিলীপ আগরওয়ালাকে নিয়ে তানজীব সারোয়ারের পোস্ট

তবে ছবিটি ভাইরাল হওয়ার সঙ্গে তার গ্রেপ্তারের সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে এমন তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে পাওয়া যায়নি।

গ্রেপ্তারের পর ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দায়ের করা মামলার সূত্রে বনানী থেকে দিলীপ আগরওয়ালাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি নিয়ে আলোচনা তৈরি হলেও গ্রেপ্তারের কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট মামলার কথাই জানিয়েছে পুলিশ।

৬৭৮ কোটি টাকার লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন

দিলীপ আগরওয়ালার বিরুদ্ধে চলমান মামলার অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে সোনা ও হীরার ব্যবসার লেনদেন। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের গুলশান অ্যাভিনিউয়ের শোরুম ও কার্যালয়কে কেন্দ্র করে চোরাচালান ও অর্থপাচারের ঘটনা ঘটে।

সিআইডির অনুসন্ধানের বরাতে মামলায় বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির বৈধভাবে আমদানি করা স্বর্ণ ও হীরার মূল্য ছিল ৩৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার বেশি। অন্যদিকে একই সময়ে স্থানীয় বাজার থেকে ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ টাকার স্বর্ণ ও হীরা কেনা, বিনিময় কিংবা রূপান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব পণ্যের উৎস সম্পর্কে বৈধ নথি পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

দিলীপ আগরওয়ালাকে ঘিরে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সোনা ও হীরা চোরাচালান, প্রতারণা, জালিয়াতি ও অর্থপাচারের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। পরে তিনি সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে জামিনে মুক্তি পান।

এই বিপুল অঙ্কের লেনদেন এবং পণ্যের উৎস-সংক্রান্ত নথি নিয়েই তদন্তের প্রশ্ন। এত বড় অঙ্কের স্বর্ণ ও হীরা কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছিল, লেনদেনের অর্থের উৎস কী এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, এসব বিষয় তদন্তের আওতায় রয়েছে কি না, তা মামলার নথি ও তদন্তের অগ্রগতির মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।

মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে করা মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির উপ-পরিদর্শক মো. আশরাফুল হাসান আদালতে দিলীপ আগরওয়ালার তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন জানান, শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফুল ইসলামের আদালত এ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিমান্ড আবেদনে মামলার অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও পর্যালোচনার জন্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।

অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল ও জামিনের আবেদন করেন। তাদের দাবি, বিদেশ থেকে বৈধভাবে স্বর্ণ আমদানি করা হয়েছে এবং স্বর্ণ ও হীরা কেনাবেচার রেজিস্টারসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তদন্ত কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে। তারা মামলার অভিযোগও মিথ্যা বলে দাবি করেন।

আগেও গ্রেপ্তার, পরে জামিন

দিলীপ আগরওয়ালাকে ঘিরে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সোনা ও হীরা চোরাচালান, প্রতারণা, জালিয়াতি ও অর্থপাচারের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। পরে তিনি সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে জামিনে মুক্তি পান। সর্বশেষ সিআইডির করা মামলায় আবারও গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

কেন আলোচনায় তার নাম?

দিলীপ কুমার আগরওয়ালার পরিচয় শুধু ব্যবসায়ী হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। চুয়াডাঙ্গার এই ব্যবসায়ীর রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই পোস্টে তাকে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ও বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হিসেবে তার পরিচয়ের কথাও পোস্টে তুলে ধরা হয়।

/এফসি/