পুরান ঢাকার পুনরুজ্জীবনে ১৩৭ কোটি টাকার প্রকল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
পুরান ঢাকার পুনরুজ্জীবনে ১৩৭ কোটি টাকার প্রকল্প
বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা পুরান ঢাকা এখন পরিবেশগত সংকটে পড়েছে

জরাজীর্ণ অবকাঠামো, পরিবেশগত সংকট ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে পুরান ঢাকার পুনরুজ্জীবনে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ করে উন্নত বিশ্বের ‘রিজেনারেশন কনসেপ্ট’-এর আদলে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা হবে।

‘ইন্টিগ্রেটেড প্রজেক্ট ফর রিভাইটালাইজেশন অব ওল্ড ঢাকা’ শীর্ষক ১৩৬ কোটি ৮৫ লাখ ৮০ হাজার টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। পুরো অর্থই বৈদেশিক প্রকল্প অনুদান থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, পুরান ঢাকার পুনরুজ্জীবনের জন্য প্রথম ধাপে কারিগরি, স্থানিক, পরিবেশগত ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নের মাধ্যমে একটি সমন্বিত ও সম্ভাব্যতা-ভিত্তিক রূপরেখা তৈরি করা হবে। ওই রূপরেখার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিনিয়োগ-উপযোগী সাব-প্রজেক্ট এবং পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ‘ডিপিপি’ তৈরি করা হবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে বৈদেশিক অর্থায়নের সুবিধার্থে অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনায় প্রথমেই গুরুত্ব দেওয়া হবে পুরান ঢাকার বর্তমান নগর কাঠামো ও ভূমি ব্যবহারের বিস্তারিত চিত্র তৈরিতে। এ জন্য ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা বা জিআইএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি বিস্তৃত স্থানিক ডেটা বেইস তৈরি করা হবে। এতে এলাকার ভূমি ব্যবহার, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং ভবনগুলোর বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও তালিকাভুক্ত করা হবে।

এর মাধ্যমে কোথায় আবাসিক এলাকা, কোথায় বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড, কোন এলাকায় অবকাঠামোগত চাপ বেশি এবং কোন কোন স্থানে উন্নয়ন প্রয়োজন– এসব বিষয় চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক ভবন ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেও থাকবে বিশেষ গুরুত্ব। প্রকল্পের আওতায় ঐতিহাসিক ভবনগুলোর ডিজিটাল ম্যাপিং ও শ্রেণিবিন্যাস করা হবে। এসব ভবনের ঐতিহ্যবাহী চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে কীভাবে নতুন কাজে ব্যবহার করা যায়, সে জন্য ‘অ্যাডাপটিভ রিইউজ’ বা ‘অভিযোজিত পুনর্ব্যবহার’-এর নির্দেশিকা তৈরি করা হবে।

পরিবেশের দিক থেকেও পুরান ঢাকার জন্য বড় ধরনের পরিকল্পনা করা হবে। প্রকল্পের আওতায় বায়ু, পানি ও মাটির গুণগত মান পরীক্ষা করা হবে। বিশেষ করে বুড়িগঙ্গা নদীর করিডরে দূষণের মাত্রা বিশ্লেষণ করে তা কমানোর কৌশল নির্ধারণ করা হবে। একইসঙ্গে পানি, নিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে এগুলো আধুনিকীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় নকশা ও কৌশল তৈরি করা হবে।

পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক ভবন ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেও থাকবে বিশেষ গুরুত্ব। প্রকল্পের আওতায় ঐতিহাসিক ভবনগুলোর ডিজিটাল ম্যাপিং ও শ্রেণিবিন্যাস করা হবে। এসব ভবনের ঐতিহ্যবাহী চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে কীভাবে নতুন কাজে ব্যবহার করা যায়, সে জন্য ‘অ্যাডাপটিভ রিইউজ’ বা ‘অভিযোজিত পুনর্ব্যবহার’-এর নির্দেশিকা তৈরি করা হবে।

যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নও এই মহাপরিকল্পনার অন্যতম প্রধান অংশ। সরু ও জটিল সড়ক কাঠামোর কারণে যান চলাচল ও জরুরি সেবা পৌঁছানো হয়ে পড়ে কঠিন। তাই প্রকল্পে সড়কের প্রবেশগম্যতা বাড়ানো, জরুরি উদ্ধারকাজের জন্য প্রয়োজনীয় পথ তৈরি এবং ভবিষ্যৎ গণপরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে মূল্যায়ন করা হবে। নথিতে বাস ও মনোরেলসহ বিভিন্ন ট্রানজিট বিকল্প মূল্যায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণ। পুরান ঢাকার পুনরুজ্জীবনে কী ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন, প্রকল্পগুলোর আর্থিক উপযোগিতা কতটা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি সেবা সংস্থার মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করা যায়– এসব বিষয়ও বিশ্লেষণ করা হবে। পরবর্তী পর্যায়ের উন্নয়নকাজের জন্য বিশ্বব্যাংক, জাইকা ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকসহ (ইআইবি) বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে অর্থায়নের সম্ভাবনাও খোঁজা হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের নথিতে বলা হয়েছে, পুরান ঢাকা রাজধানীর ঐতিহাসিক কেন্দ্রবিন্দু এবং এখনও এটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক এলাকা। তবে দীর্ঘদিনের সীমিত অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত ও অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের কারণে এলাকাটির ভৌত, পরিবেশগত ও কার্যকারিতাগত ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে। পুরনো নগর কাঠামো বর্তমান জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চাহিদা পূরণে সক্ষম না হওয়ায় জীবনযাত্রার মান ও অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

রাজউকের নথি অনুযায়ী, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ১৮০ দিনের কর্মসূচি এবং আগামী পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনার আওতায় পুরান ঢাকা পুনরুজ্জীবন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণ করে পুরান ঢাকা ও হাজারীবাগ এলাকাকে উন্নত বিশ্বের ‘রিজেনারেশন কনসেপ্ট’-এর আদলে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে এখনো এটি মূল নির্মাণ বা অবকাঠামো বাস্তবায়নের প্রকল্প নয়; বরং ভবিষ্যতের বড় উন্নয়নকাজের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা, মূল্যায়ন ও বিনিয়োগ-উপযোগী প্রকল্প তৈরির প্রস্তুতিমূলক উদ্যোগ।

রাজউকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমে পুরান ঢাকার বর্তমান অবস্থা, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, পরিবেশ, যোগাযোগ ও নাগরিক সেবার একটি সমন্বিত চিত্র তৈরি করা হবে। এরপর এসব তথ্যের ভিত্তিতে ঐতিহ্য সংরক্ষণ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, পানি নিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নসহ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প চিহ্নিত করা হবে।

/এফসি/