সেই দাশেরকান্দি শোধনাগারে ফের হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

সেই দাশেরকান্দি শোধনাগারে ফের হাজার কোটি টাকার প্রকল্প
রাজধানী ঢাকার আফতাবনগরের কাছে দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার।

ভুল পরিকল্পনা ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দাশেরকান্দি পয়ঃবর্জ্য শোধনাগারের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এখন এই শোধনাগারের পূর্ণাঙ্গ সুবিধা পেতে আরেকটি প্রকল্প প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা ওয়াসা। আর এই প্রকল্পে আরও এক হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হবে। অর্থাৎ প্রথমেই যথাযথভাবে কাজ না করায় সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় হয়েছে। তবে এ বিষয়ে ওয়াসা বলছে, পূর্ণাঙ্গ সুফল পেতে এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিন বছর আগে ২০২৩ সালে চালু হওয়া দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগারের দৈনিক ৬০ কোটি লিটার পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্কের (ড্রেনেজ লাইন) অভাবে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহার হচ্ছে সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম। তাই এই সমস্যা সমাধানে নতুন করে আরও ১ হাজার ৪৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয় করতে যাচ্ছে ঢাকা ওয়াসা।

দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার নির্মাণে চীনের এক্সিম ব্যাংকের দেওয়া ২ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকার ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ার কথা ২০২৭ সালে। অর্থাৎ আগের প্রকল্পের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানোর আগেই শুধু যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে নতুন করে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এতে ঢাকা ওয়াসার প্রকল্প পরিকল্পনা, বিভিন্ন পর্যায়ের কাজের মধ্যে সমন্বয় এবং ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ঢাকা ওয়াসার প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, মহাখালী ও বাড্ডার আংশিক এলাকায় প্রায় ৭৫ শতাংশ পয়োনিষ্কাশন লাইন নির্মাণ করা হবে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন বছরে প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৯ লাখ মানুষ সরাসরি পয়োনিষ্কাশন সেবার আওতায় আসবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন প্রকল্পটির প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে ঢাকা ওয়াসা। প্রস্তাবিত ব্যয়ের মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ১ হাজার ৩৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা এবং সংস্থাটির নিজস্ব অর্থায়ন ১০ কোটি টাকা। এখন প্রকল্পটি যাচাই-বাছাই করবে পরিকল্পনা কমিশন।

বড় বাজেটের নতুন প্রকল্প কেন?

ওয়াসার কর্মকর্তাদের মতে, পয়ঃবর্জ্য সংগ্রহ ও প্রবাহের ড্রেনেজ লাইন ছাড়া শোধনাগার নির্মাণের সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্পের ক্ষেত্রে শোধনাগার নির্মাণের পরও প্রয়োজনীয় ড্রেনেজ লাইনের সংকট রয়ে গেছে। ফলে একদিকে বিদ্যমান সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকছে, অন্যদিকে সেই ঘাটতি পূরণে নতুন করে সরকারি অর্থ বিনিয়োগের প্রয়োজন হচ্ছে।

দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগারটির নকশাগত পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনের সক্ষমতা দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন লিটার বা ৬০ কোটি লিটার। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে সেখানে পরিশোধন হচ্ছে প্রায় ২৮০ মিলিয়ন লিটার বা ২৮ কোটি লিটার বর্জ্য। অর্থাৎ সক্ষমতার মাত্র ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দাশেরকান্দি পয়ঃবর্জ্য শোধনাগারের প্রকল্পের এই ঘাটতির মূল কারণ হলো ড্রেনেজ ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতা। যেসব এলাকার বাসিন্দাদের এই প্রকল্পের আওতায় সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল, সেসব এলাকার পয়োনিষ্কাশন লাইনের সঙ্গে দাশেরকান্দি শোধনাগারের সরাসরি কোনো সংযোগ নেই। মূলত ড্রেনেজ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় এই প্রকল্পের অধীন এলাকাগুলোর পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না।

৯৪৬ কোটি টাকা যাবে পাইপলাইন নির্মাণে

প্রস্তাবিত প্রকল্পের সিংহভাগ ব্যয় রাখা হয়েছে পয়োনিষ্কাশন লাইন ও স্যুয়ারেজ লিফটিং স্টেশন (এসএলএস) নির্মাণে। প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, এসব কাজের নকশা, সরবরাহ, নির্মাণ ও চালুকরণে দুটি প্যাকেজে মোট ৯৪৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম প্যাকেজে ৫৩৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৫১ দশমিক ১৯ শতাংশ। দ্বিতীয় প্যাকেজে ৪১০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৩৯ দশমিক ৩১ শতাংশ।

এ ছাড়া পয়ঃবর্জ্য পরিষ্কারের সরঞ্জাম কিনতে ৫ কোটি ৭০ লাখ, ভূমি উন্নয়নে ২ কোটি এবং পরামর্শক ফি বাবদ ২৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে সোমবার ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহা. মনিরুজ্জামান সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে মুঠোফোনে বলেন, ‘দাশেরকান্দি শোধনাগারের পূর্ণ সুফল পেতে এই ব্যয় জরুরি। তবে এই বিষয় এখনই বিস্তারিত বলতে পারছি না। আমাদের জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন।’

নতুন প্রকল্প গ্রহণ করার বিষয়ে জানতে সোমবার ঢাকা ওয়াসার উপ-প্রধান জনতথ্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাদেরের মুঠোফোনে বারবার কল দিলেও তিনি ধরেননি। পরে এ বিষয়ে জানতে তার মুঠোফোন নম্বরে খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।

সমন্বয়ের ঘাটতি, ব্যয়ের দায় কার

৩ হাজার ৩৭০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বিনিয়োগের পরও শোধনাগারটির সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি ব্যবহার না করতে পারার বিষয়টি প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নয়, আগের প্রকল্পের সঙ্গে বাস্তবতার সমন্বয় কীভাবে করা যায়, নেটওয়ার্ক নির্মাণের ঘাটতি কেন রয়ে গেছে এবং এর দায় কোন পর্যায়ে ও কার-সেসব বিষয়ও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

এই বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, অতীতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও পানি নিষ্কাশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সুফল নিশ্চিত করা যায়নি। অতীতের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ না নিলে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না।

ঢাকার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পরিকল্পনার বদলে খণ্ডিত উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, সামগ্রিক ভূপ্রকৃতি বিবেচনা না করে খণ্ডিত নেটওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে। বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ছাড়াই বারবার ব্যয়বহুল উদ্যোগ নেওয়ায় প্রকল্পগুলো একধরনের ‘প্রকল্প বাণিজ্যে’ পরিণত হচ্ছে। অথচ এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমছে না।

/বিবি/