ছাত্র অধিকারকর্মীকে নির্যাতন, ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ

ঢাকা কলেজ প্রতিনিধি
ঢাকা কলেজ প্রতিনিধি
ছাত্র অধিকারকর্মীকে নির্যাতন, ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ
ছাত্রদল নেতার ছবি (বায়ে) ও ভুক্তভোগীর আঘাতের চিহ্ন

ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের এক নেতার বিরুদ্ধে ছাত্র অধিকার পরিষদের এক কর্মীকে কক্সবাজারে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন, অপহরণের চেষ্টা এবং জোর করে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) নিউমার্কেট থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী নাইমুল হাসান জুবায়ের।

অভিযোগে ছাত্রদল নেতা সাজ্জাদ হোসেন জেমিনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে তাকে মারধর, আটকে রাখা, মাদকদ্রব্য দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা এবং ছবি-ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের হুমকি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেমিন। তার দাবি, জুবায়ের ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাকে থানায় হস্তান্তরের উদ্দেশ্যেই সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল।

সাজ্জাদ হোসেন জেমিন ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। অভিযোগে তার সঙ্গে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক সদস্য আরিয়ান ও ইমরান ফকিরসহ আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের জেমিনের অনুসারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারী। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এর আগে শিক্ষককে হেনস্তার অভিযোগে জেমিনকে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

নাইমুল হাসান জুবায়ের ঢাকা কলেজের দর্শন বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং ঢাকা কলেজ ছাত্র অধিকার পরিষদের সাবেক কার্যকরী সদস্য।

অভিযোগে যা বলা হয়েছে

নিউমার্কেট থানায় দেওয়া অভিযোগে জুবায়ের বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর ছাত্রদল নেতা জেমিনের উদ্যোগে তিনি কক্সবাজার ভ্রমণে যান। ৩ অক্টোবর ভোর চারটার দিকে তাকে ঘুম থেকে তুলে জেমিনের হোটেল কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জেমিনসহ কয়েকজন গামছা দিয়ে তার মুখ ও হাত বেঁধে ছুরি, কাঁচি, বেল্ট, প্লাস্টিকের স্টাম্প ও গামছা দিয়ে মারধর করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

জুবায়েরের অভিযোগ, তাকে আটকে রেখে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ কয়েকজন নেতার নাম উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা স্বীকারোক্তি দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

অভিযোগে আরও বলা হয়, জুবায়েরকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো ও সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে ইয়াবাসহ বিভিন্ন নেশাজাতীয় দ্রব্যের সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা করা হয়। তাকে ব্ল্যাকমেইল করার উদ্দেশ্যে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।

জুবায়ের আরও অভিযোগ করেন, পরে তাকে অপহরণ করে ঢাকায় নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়। কুমিল্লার নূরজাহান হোটেল থেকে তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এর আগে তার টাকা, ব্যাগ ও মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

জুবায়ের বলেন, ‘আমি একজন নির্দোষ জুলাই যোদ্ধা। আমার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমার ওপর পরিকল্পিত নির্যাতন ও রাজনৈতিক চক্রান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং এর বিচার চাই।’

ঘটনার বিষয়ে কক্সবাজারের সি শার্ক হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষ্য, ফুটেজ পরীক্ষা করলে ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।

যা বলছেন জেমিন

অভিযোগ অস্বীকার করে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেন জেমিন বলেন, জুবায়ের ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত। কক্সবাজারে যাওয়ার পর তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং তার সঙ্গে কথা বলে তারা বিষয়টি জানতে পারেন বলে দাবি করেন তিনি।

জেমিন বলেন, ‘সে আমাদের সঙ্গে উদ্ধত আচরণ করছিল। যেহেতু সে কলেজ থেকে আমাদের সঙ্গে গিয়েছিল, তাই তাকে কলেজের নিকটবর্তী থানায় হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু যাত্রাবিরতির সময় আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সে পালিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে না পেয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মাইকিং করা হয়। প্রায় ২০ মিনিট অপেক্ষা করে আমরা সেখান থেকে চলে আসি।’

জুবায়ের কলেজের কারও প্ররোচনায় তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন এবং থানায় মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছেন বলেও দাবি করেন জেমিন। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন।

শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে জেমিন বলেন, ‘আমি কোনো শারীরিক নির্যাতন করিনি। তবে আমাদের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর সে যাদের কাছে ছিল, তারাও তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে থাকতে পারে।’

থানার বক্তব্য

নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আইয়ুব হোসেন বলেন, ভুক্তভোগী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগকারীর সঙ্গে কথা বলে অভিযোগটি পড়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি কক্সবাজারে ঘটেছে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি যেখানে ঘটেছে, সেখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করব। এ বিষয়ে আগে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তদন্তের কথা ছাত্রদলের

ঘটনাটি নিয়ে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সদস্যসচিব মিল্লাদ হোসেন বলেন, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী তাদের কাছে এবং থানায় অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন।

তিনি বলেন, ‘প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন ও অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পর যদি এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি কেন্দ্রীয় সংগঠনকেও অবগত করা হবে।’

মিল্লাদ হোসেন আরও বলেন, ‘ছাত্রদলে সংগঠনপরিপন্থী কোনো কাজ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় সংগঠন বিষয়টি আমলে নিয়ে সত্যতা পেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো সুযোগ ছাত্রদলে নেই।’

/এমআর/