ইশরাকের পদত্যাগ এবং ঘুণ্টিঘর এলাকার আসল চিত্র

ইশরাকের পদত্যাগ এবং ঘুণ্টিঘর এলাকার আসল চিত্র
অস্ত্র হাতে মাদক বিরোধী অভিযানে ইশরাক হোসেন

রাজধানীর গেণ্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর এলাকাটা আসলে কেমন? এটা কি সত্যই খুব বিপজ্জনক অথবা এই এলাকাটি কি সত্যই মাদক ব্যবসায়ী আর মাদকসেবীদের স্বর্গরাজ্য? মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের পর প্রশ্নগুলো আরও বেশি ঘুরপাক খাচ্ছে।

গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) এই ঘুণ্টিঘর এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়েছেন ইশরাক হোসেন এবং তার সহযোগীরা। সেই অভিযানে ইশরাক ও তার সহযোগীদের অস্ত্র উঁচিয়ে ধরার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এর জেরে ইশরাককে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক ঘুণ্টিঘর এলাকার ভয়াবহতার একটা চিত্র তুলে ধরেন।

ইশরাকের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে পুলিশও ভয় পায়। কারণ, দিনের বেলায়ও সেখানে ছাদ থেকে পুলিশের ওপর গুলি ছোড়া হয়। ঘুণ্টিঘর এলাকার আসল চিত্রটা কেমন, গতকাল সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের পর সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের এই প্রতিবেদক তা জানার চেষ্টা করেছেন। গতকাল বিকেল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত যেখানে ছিলেন এই প্রতিবেদক।

সরেজমিনে দেখা গেছে, দিনে এবং রাতে সমানতালে রেললাইনের দুই পাশে দেদারসে চলছে মাদকের বেচাকেনা। ইয়াবা, গাঁজা ও হেরোইনের মতো মাদক বিক্রির পাশাপাশি সেখানে বসেই সেবন করার ব্যবস্থা রেখেছে মাদক ব্যবসায়ীরা। এমনকি সেখানে সেবনকারীদের জন্য শারীরিক মনোরঞ্জনের ব্যবস্থাও আছে।

স্থানীয়ভাবে জায়গাটি চায়না প্রজেক্ট হিসেবে পরিচিত। তবে সরেজমিনে সেখানে পরিত্যক্ত মাঠ ছাড়া প্রজেক্টের কিছুই নজরে আসেনি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রেললাইনের দুই পাশে গড়ে ওঠা ছোট ছোট ঝুপড়িঘরে অবাধেই চলছে মাদকের বেচাকেনা। মাদকের দাম মিটিয়ে বাড়তি কিছু টাকা দিলে সেখানে বসেই আছে সেবনের ব্যবস্থা। এ ছাড়া পাশের ঝুপড়ি ঘরগুলোতে অবাধে চলছে দেহব্যবসা।

সোমবার সন্ধ্যায় ঘুণ্টিঘর এলাকার চিত্র। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
সোমবার সন্ধ্যায় ঘুণ্টিঘর এলাকার চিত্র। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

ঝুপড়িগুলোর আশপাশে লাঠি, চাপাতি ও অন্যান্য ধারালো অস্ত্র নিয়ে পাহারায় থাকে মাদক ব্যবসায়ীদের লোক। পুলিশ বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ির চলাফেরার ওপরও নজর রাখে তারা। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে মাদক বিক্রি ও সেবনের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। এই নেটওয়ার্কের সদস্য সংখ্যা শতাধিক। এর মধ্যে নারী সদস্যও আছে।

বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা, ঘুণ্টিঘর এলাকার চায়না প্রজেক্টের মাঠের পাশের ফাঁকা জায়গাগুলোতে ভিড় লেগেই থাকে। এক কথায় মাছের বাজারের মতো সেখানে মাদকের হাট চলছে। মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে নানা ধরনের সিগন্যাল দেওয়া হচ্ছে মাদকসেবীদের। হাঁটতে হাঁটতেই দুজনকে বলতে শোনা যাচ্ছিল ‘আজ কম দিয়েছি মাত্র ২০০ পিছ।’ রেললাইন ঘেঁষে এগিয়ে যেতেই দেখা গেল, ফাঁকা মাঠের পাশের দেয়াল ঘেঁষে তৈরি অস্থায়ী ছাউনিতে মাদক সেবন করছে কয়েকজন। তাদের সুরক্ষা দিতে সড়কের দুই প্রান্তেই প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত পাহারায় আছে সিন্ডিকেটের লোকজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চলাচলের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখে তারা।

রেল লাইনের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর পরই এই প্রতিবেদককে অনুসরণ করতে শুরু করে অন্তত ৭-৮ জনের একটি দল। খানিক পর ফুলপ্যান্ট পরা এক রিকশাচালক সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘যাবেন?’ ‘না’ বলার পরও সেই রিকশাচালক কথা বাড়াতেই থাকে। প্রায় আধা ঘণ্টা সেখানে এই প্রতিবেদকের অবস্থানকালে ওই রিকশাচালক সরেননি।

অনুসন্ধান বলছে, এসব রিকশাচালকও একই সিন্ডিকেটের সদস্য। কাস্টমারদের কাছে মাদক পৌঁছে দিতে এসব রিকশাচালকদের ব্যবহার করে মাদককারবারিরা। বিনিময়ে ভাড়া হিসেবে বড় অঙ্কের টাকা পায় তারা। এ কারণেই এসব চালক লম্বা সময় ধরে একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকে। পাশাপাশি নজরদারির কাজও করে এরা।

সশস্ত্র পাহারার সামনে পুলিশও অসহায়

স্থানীয়দের দাবি, সেখানে যারা মাদক কেনাবেচা করেন, তাদের সশস্ত্র পাহারার কারণে পুলিশও বাধার মুখে পড়ে। দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি এখানে রেললাইন থাকায় কারবারিরা সহজেই পাথর নিক্ষেপ করে পুলিশের ওপর চড়াও হয়। তাদের দেওয়া তথ্য মতে, কিছুদিন আগেও এক পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে আহত করে সিন্ডিকেটের সদস্যরা।

সরেজমিনে এর প্রমাণও মিলেছে। গতকাল সন্ধ্যায় চায়না প্রজেক্ট গেটের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল গেণ্ডারিয়া থানা পুলিশের একটি পিকআপ, এর ঠিক ১০০ গজ সামনেই আরও একটি পুলিশের পিকআপ ছিল। দুটি গাড়িতে আসা পুলিশ সদস্যরা চায়না প্রজেক্টের গেইট সংলগ্ন মূল রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিলেন। কিছুক্ষণ পরে এসে সেখানে যোগ দেন মোটরসাইকেলে আসা আরও দুজন পুলিশ সদস্য। ঠিক রেলগেইট বক্সের বিপরীত পাশে মোটরসাইকেল নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায় আরও দুজনকে। সেখানে তখন অন্তত ১০ জন পুলিশ সদস্য ছিলেন, অথচ এর ঠিক ২০০ গজের মধ্যেই চলছিল রমরমা মাদক ব্যবসা। সেখানে উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা কথা বলতে রাজি হননি। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার অনুরোধ করেন তারা।

অনুসন্ধান চলাকালে একটি তালিকা আসে প্রতিবেদকের হাতে। গত মার্চের দিকে তৈরি করা পুলিশের ওই তালিকায় ঘুণ্টিঘর এলাকার মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত হিসেবে রহিমা নামে এক নারীর নাম পাওয়া যায়। তথ্য বলছে, সেখানকার নামাপাড়া রেললাইন বস্তি এলাকার মাদক কারবার ও বিক্রির স্থানগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন রহিমা ও তার মেয়ে। তার স্বামী হযরত স্থানীয়ভাবে পরিচিত গ্যাং বেলবাট্টি গ্রুপের প্রধান । তবে এলাকায় তাদের নিয়মিত দেখা যায় না বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই চায়না প্রজেক্টের গেইট দিয়ে বেরিয়ে আসেন এক নারী মাদক কারবারি। তিনি এ সময় জোরে জোরে পুলিশকে বলতে থাকেন ‘স্যার, বিষয়টা ভালো লাগছে না।’ এটা বলতে বলতেই তিনি পাশের একটি টং দোকান থেকে সিগারেট কেনেন, এরপর আবার রেললাইনের দিকে হেঁটে যান।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ঘুণ্টিঘর এলাকার এক চায়ের দোকানদার বলেন ‘এলাকাটা ধ্বংস কইরা ফালাইছে। ৫ আগস্টের পর ঘুণ্টিঘরকে এরা স্পট বানাইছে।’

এসব বিষয়ে মুঠোফোনে কথা হয় গেণ্ডারিয়া থানার ওসি মনিরুজ্জামান মনিরের সঙ্গে। তিনি জানান, ঘুণ্টিঘর এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করা হয়। কয়েকদিন পরেই তারা জামিনে বেরিয়ে এসে একই কাজ শুরু করেন।

জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

ইশরাকের পদত্যাগের পর অভিযান

সোমবার বিকাল ৩টার দিকে ঘুণ্টিঘর এলাকায় মাদকবিরোধী যৌথ অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ঢাকা দক্ষিণ বিভাগ ও এসআরবি-৩। ছদ্মবেশে থাকা সদস্যরা অভিযান শুরু করলে সেখানে থাকা লোকজন দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। অনেকে দেয়াল টপকে সটকে পড়েন। এ সময় দুই নারীসহ ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের প্রত্যেককে তিন মাসের কারাদণ্ড ও ১০০ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে জুয়েল, তৌহিদ সাগর, মো. সুমন, আনাল, মো. নাসির, হিরা, মোতালেব মিয়া, আবদুল লতিফ, মো. সোহেল, নবী হোসেন, রুবেল ও আশরাফ উদ্দীনের নাম পাওয়া গেছে। বাকি তিনজনের নাম জানা যায়নি।

অভিযানের সময় দুই নারীর কাছে ইয়াবা ও হেরোইন সেবনের সরঞ্জাম পাওয়া যায়। অন্যদের অধিকাংশের কাছ থেকে গাঁজা ও হেরোইন উদ্ধার করতে দেখা যায়। কিন্তু অভিযান শেষে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সদস্যরা চলে যেতেই আবার আগের রূপে ফেরে ঘুণ্টিঘর এলাকা।

/আরএ/