বিক্ষোভের আগেই নজরদারি, দিল্লিযাত্রা ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে মোদি সরকার

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
বিক্ষোভের আগেই নজরদারি, দিল্লিযাত্রা ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে মোদি সরকার
নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভ ঠেকাতে দায়িত্ব পালন করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ছবি: রয়টার্স

রাজধানীতে বিক্ষোভ ঠেকাতে শুধু সমাবেশস্থলেই বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হচ্ছে না, নজর রাখা হচ্ছে শহরের বাইরেও। কারা দিল্লিতে যাবেন, কারা বিক্ষোভে যোগ দিতে পারেন এবং তাদের যাত্রা কীভাবে ঠেকানো যায়, তা নিয়ে আগেভাগেই সক্রিয় হয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ। এখন পর্যন্ত বিক্ষোভে অংশ নিতে যাওয়া পঁচ সহস্রাধিক নেতাকর্মী ও সমর্থককে আটক করা হয়েছে।

নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ ঘিরে এমন নজরদারি ও আটকের তথ্য সামনে এসেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের বিক্ষোভের অভিজ্ঞতা থেকে এবার আন্দোলনকারীরা দিল্লিতে পৌঁছানোর আগেই তাদের আটক করছে। প্রয়োজনে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে মোদি সরকার।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব কয়েকটি রাজ্যের পুলিশপ্রধান (ডিজিপি) ও কয়েকজন পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে আগে এ ধরনের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের নিজ নিজ এলাকা থেকে দিল্লিতে যাওয়া ঠেকানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি সম্ভাব্য আন্দোলনকারীদের অর্থের উৎস খতিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনে প্রতিরোধমূলক আটকের বিষয়েও আলোচনা হয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি যাচাই করতে ৮ অক্টোবর আবার বৈঠক করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকের নিজ রাজ্য মহারাষ্ট্রে ৪ অক্টোবরই পুলিশের ডিজিপি কার্যালয় থেকে বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে একটি ‘গোপনীয় চিঠি’ পাঠানো হয়। এরপর সম্ভাব্য আন্দোলনকারীদের ওপর নজরদারি শুরু হয়। ৪ অক্টোবর দেওয়া বিক্ষোভকারীদের কয়েকটি নোটিশে ওই গোপন চিঠির উল্লেখ করে বলা হয়, সেটির ভিত্তিতেই তাদের নোটিশ দেওয়া হচ্ছে।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে  ৮ অক্টোবর বেঙ্গালুরুতে আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য দেন ককরোচ জনতা পার্টির নেতা অভিজিৎ দিপকে। শনিবার নয়াদিল্লিতে তাকে আটক করা হয়। ছবি: রয়টার্স
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ৮ অক্টোবর বেঙ্গালুরুতে আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য দেন ককরোচ জনতা পার্টির নেতা অভিজিৎ দিপকে। শনিবার নয়াদিল্লিতে তাকে আটক করা হয়। ছবি: রয়টার্স

সূত্রের দাবি, আগাম প্রস্তুতির পেছনে রয়েছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর আগের অভিজ্ঞতা। তাদের ধারণা ছিল, এর আগে যন্তর মন্তরে সিজেপির বিক্ষোভে বেশি মানুষের সমাগম হবে না। এ কারণে আন্দোলনকারীদের ঠেকাতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কিন্তু নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করে জুলাইয়ের ওই বিক্ষোভ বড় আকার ধারণ করে। শেষ পর্যন্ত ওই বিক্ষোভের জেরে জুলাইয়ে ভারতের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। একটি সূত্রের ভাষ্য, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের সঙ্গে সম্পর্কিত আগের বিক্ষোভগুলোকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এ কারণেই সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হতে পেরেছিলেন।

তাই এবার দিল্লি পুলিশ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে (এমএইচএ) জানিয়েছে, বাইরে থেকে যাতে মানুষ দিল্লিতে আসতে না পারেন, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ, বিপুলসংখ্যক মানুষের জমায়েত সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।

মহারাষ্ট্রজুড়ে পাঠানো চিঠিটিতে সই করেছিলেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইনশৃঙ্খলা) লক্ষ্মী গৌতম। চিঠিতে ১০ অক্টোবর যন্তর মন্তরে সিজেপির ডাকা বিক্ষোভের কথা উল্লেখ করে পুলিশকে বলা হয়, বিক্ষোভে যোগ দিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের সেখানে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও নিতে বলা হয়।

এ ক্ষেত্রে মহারাষ্ট্রকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ধারণা করা হয়েছিল, অভিজিৎ দিপকে মহারাষ্ট্রের বাসিন্দা হওয়ায় ওই রাজ্য থেকে অনেক মানুষ বিক্ষোভে যোগ দেবেন। একটি সূত্র জানায়, মহারাষ্ট্রে অনেক সক্রিয় বামপন্থী সংগঠন রয়েছে। এসব সংগঠন বিক্ষোভে জোরালো সমর্থন দিতে পারে বলেও ধারণা করা হয়েছিল।

৪ অক্টোবরের বৈঠকে কয়েকটি নির্দিষ্ট সংগঠনের সদস্যদেরও দিল্লি যাওয়া ঠেকানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এর আগে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদেরও আটকে দেওয়ার কথা বলা হয়।

সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, একই দিন মহারাষ্ট্রের ডিজিপির কার্যালয় থেকে কয়েকটি পুলিশ কমিশনারেট ও জেলার পুলিশ ইউনিটে গোপন চিঠি পাঠানো হয়। সেসব চিঠিতেও একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছিল।

এ বিষয়ে একটি সূত্র বলেছে, ‘ডিজিপি নির্দেশ দিয়েছিলেন, কাউকে আটক করা যাবে না। তাই ডিজিপির কার্যালয় থেকে পাঠানো চিঠির ভিত্তিতে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট বিক্ষোভকারীদের নোটিশ দিয়েছে।’

এর এক দিন পর, ৫ অক্টোবর দিপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘আসলে মহারাষ্ট্র পুলিশও নিখুঁত নয়।’ পরদিন রাজ্যে সিজেপির সদস্যদের নোটিশ দেওয়ার বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন দিপকে। মহারাষ্ট্র পুলিশের ডিজিপির কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, রাজ্যে ৫০টির কম নোটিশ দেওয়া হয়ে থাকতে পারে এবং পুলিশ কাউকে আটক করেনি।

তবে মুম্বাই পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, ৯ অক্টোবর শুক্রবার শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০০-এর বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। ১০ অক্টোবর শনিবারের বিক্ষোভে যোগ দিতে তারা যেন দিল্লি যেতে না পারেন, সে জন্য তাঁদের আটক করা হয় বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

ওই সূত্র আরও জানায়, বিক্ষোভে যোগ দিতে আসা ব্যক্তিদের মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন আইনের ধারায় আটক করেছে পুলিশ।

/বিবি/