জলবায়ুর স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় ১৪০ কোটি ডলার অর্থায়ন সম্ভব: গবেষণা

জলবায়ুর স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় ১৪০ কোটি ডলার অর্থায়ন সম্ভব: গবেষণা
নিজস্ব প্রতিবেদক

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্য খাতে সৃষ্ট প্রভাব মোকাবিলায় দেশীয় অর্থায়ন, উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে বাংলাদেশ। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের (সি৩ইআর) এক প্রতিবেদনে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যবিষয়ক জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এইচএনএপি) ২০২৬-২০৩১ বাস্তবায়নে অর্থায়নের সম্ভাব্য উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১৪০ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে তীব্র তাপপ্রবাহ, জলবায়ু-সংবেদনশীল রোগ, অনিরাপদ পানি এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার মতো সমস্যা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের জন্য অর্থ সংগ্রহের পথও তুলে ধরা হয়েছে।
জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ইকবাল কবীর বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জাতীয় স্বাস্থ্য অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৬-৩০ বাস্তবায়নে বাংলাদেশের জন্য আগামী ৫ বছরে ১৭ হাজার কোটি টাকা (১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) প্রয়োজন হবে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের (সিথ্রিইআর) উপদেষ্টা ড. আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্য খাতে ক্রমবর্ধমান চাপ বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও অর্থায়নে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। স্বাস্থ্য, পানি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এইচএনএপি দিকনির্দেশনা দেবে। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোর সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ের এ উদ্যোগকে সহায়তা দিতে আন্তর্জাতিক অভিযোজন অর্থায়নও প্রয়োজন, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় অনুদানের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া জরুরি।
গবেষণায় ৪টি উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় সরকারি অর্থায়ন থেকে ৩৮ কোটি ডলার, অন্যান্য খাতের স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অবদান থেকে ৩৬ কোটি ডলার, উন্নয়ন সহযোগীদের কর্মসূচি থেকে ৫২ কোটি ডলার এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নব্যবস্থা থেকে ১৪ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
এগুলো প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা, নিশ্চিত অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি নয়। একাধিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করা গেলে শুধু স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের ওপর নির্ভরতা কমবে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশীয় ও বিভিন্ন খাতের বিনিয়োগে মেটানো সম্ভব ৫৩ শতাংশ
দেশীয় অর্থায়নের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের কথা বলা হয়েছে। সরকারি প্রকল্প তৈরির সময় জলবায়ু সহনশীলতার বিষয়টি যুক্ত করা গেলে এসব অর্থ দিয়ে স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রস্তুতি এবং চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা সম্ভব হতে পারে।
স্বাস্থ্য খাতের বাইরের বিভিন্ন খাতের বিনিয়োগও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। উন্নত নিকাশিব্যবস্থা ও পয়োনিষ্কাশনের মাধ্যমে রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং বন্যাসহিষ্ণু অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখাও সহজ হবে।

গবেষণার প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশীয় অর্থায়ন ও অন্যান্য খাতের অবদান মিলিয়ে এইচএনএপির মোট অর্থায়ন চাহিদার প্রায় ৫৩ শতাংশ সংগ্রহ করা সম্ভব হতে পারে। তবে অন্যান্য খাতের বিনিয়োগের শুধু স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অংশটুকুই এ পরিকল্পনার অর্থায়ন হিসেবে গণনা করা হবে। একই অর্থ একাধিকবার হিসাব করা এড়াতে সুস্পষ্ট হিসাবপদ্ধতি অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কপ৩১ সামনে রেখে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সুযোগ
গবেষণায় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সবচেয়ে বড় একক উৎস হিসেবে প্রায় ৩৭ শতাংশ অর্থায়ন পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক, ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের কর্মসূচিগুলোকে এইচএনএপির অগ্রাধিকারের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে।
সম্ভাব্য অর্থায়নের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্য অবকাঠামো, রোগ পর্যবেক্ষণ, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি। প্রস্তাবিত অর্থায়নের মধ্যে সহজ শর্তের ঋণ ও বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এ অর্থায়ন নির্ভর করবে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমঝোতার ওপর। অন্যান্য কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে এইচএনএপিতে স্থানান্তর করা যাবে না।
এ ছাড়া গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, অ্যাডাপটেশন ফান্ড এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য তহবিলের (এলডিসিএফ) মাধ্যমে অর্থায়নের সম্ভাবনাও চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব তহবিলে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প প্রস্তাব দিয়ে রোগের আগাম সতর্কবার্তা, তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সম্পর্কে পরামর্শ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং উপকূলীয় ও বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষের অভিযোজন কার্যক্রমে সহায়তা চাওয়া যেতে পারে।
কপ৩১-এর আগে এ অর্থায়ন পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় রোগ প্রতিরোধ ও আগাম প্রস্তুতির মতো কার্যক্রমে অনুদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ, এসব কার্যক্রম থেকে সরাসরি আয় হয় না।
প্রস্তাবিত ১৪ কোটি ডলারের মধ্যে কতটা অনুদান পাওয়া সম্ভব হবে এবং এর বিপরীতে অন্য উৎস থেকে কত অর্থায়ন প্রয়োজন হবে, তা নির্ধারণে আরও প্রকল্প প্রস্তুতি ও মূল্যায়ন করতে হবে। একইসঙ্গে অন্যান্য উৎসের অর্থের সঙ্গে দ্বৈত হিসাব এড়ানোর বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
চারটি অগ্রাধিকার খাতে প্রয়োজন ৯৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার
এইচএনএপির বিনিয়োগ কাঠামোর চারটি উপাদানে মোট ৯৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার, অর্থাৎ পরিকল্পনার মোট অর্থায়ন চাহিদার ৬৯ শতাংশ প্রয়োজন হবে।
এর মধ্যে জলবায়ু সহনশীল ও কম কার্বন নিঃসরণকারী অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য ৩৫ কোটি ডলার; সমন্বিত ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কবার্তা ও নিঃসরণ পর্যবেক্ষণের জন্য ২৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার; জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী গড়ে তুলতে ২১ কোটি ডলার এবং নেতৃত্ব ও সুশাসন জোরদারে ১৪ কোটি ডলার প্রয়োজন হবে।

প্রস্তাবিত কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে বন্যা ও উপকূলীয় দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর উন্নয়ন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং দুর্যোগের সময় টিকাদান কার্যক্রম চালু রাখতে টিকা সংরক্ষণের শীতল সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে রোগ পর্যবেক্ষণব্যবস্থার সমন্বয় করা গেলে রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি আরও কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুত করা সম্ভব হবে।
সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টনে অর্থায়ন নিশ্চিত করার সুপারিশ
গবেষণায় স্বাস্থ্য খাতের নতুন উন্নয়ন প্রকল্পে জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যয় নির্ধারণ ও অর্থায়ন পরিকল্পনা তৈরির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন এবং জলবায়ু ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের হিসাব রাখতে সরকারের ‘আইবাস++’ হিসাবব্যবস্থায় সুনির্দিষ্ট কোড চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলে আবেদন করার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মাধ্যমে সমন্বয়েরও সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, পরিকল্পনা কমিশন জলবায়ু ও স্বাস্থ্যবিষয়ক মূল্যায়নে সহায়তা করতে পারে এবং বিভিন্ন খাতের বিনিয়োগের মধ্যে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অবদান চিহ্নিত করতে পারে।
বিদ্যমান অর্থের উৎস চিহ্নিত করা, উন্নয়ন সহযোগীদের অবদান নিয়ে সমঝোতা করা এবং সুস্পষ্ট সময়সীমা ও পরিমাপযোগ্য স্বাস্থ্যগত ফলাফলসহ প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা গেলে এ অর্থায়ন পরিকল্পনাকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করার পথ তৈরি হতে পারে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক স্তর থেকে অর্থায়ন পাওয়ার বড় সুযোগ আছে। কিন্তু যথাযথভাবে সেটি আনা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য সরকারি, বেসরকারি ও এনজিওগুলোর সমন্বয় জরুরি। ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
আলোচকরা স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্টদের জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকি নিয়ে প্রশিক্ষিত করার ওপর জোর দেন। এছাড়া শিক্ষা কারিকুলামে জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি যুক্ত করার পরামর্শ দেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্য খাতে সৃষ্ট প্রভাব মোকাবিলায় দেশীয় অর্থায়ন, উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে বাংলাদেশ। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের (সি৩ইআর) এক প্রতিবেদনে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যবিষয়ক জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এইচএনএপি) ২০২৬-২০৩১ বাস্তবায়নে অর্থায়নের সম্ভাব্য উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১৪০ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে তীব্র তাপপ্রবাহ, জলবায়ু-সংবেদনশীল রোগ, অনিরাপদ পানি এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার মতো সমস্যা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের জন্য অর্থ সংগ্রহের পথও তুলে ধরা হয়েছে।
জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ইকবাল কবীর বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জাতীয় স্বাস্থ্য অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৬-৩০ বাস্তবায়নে বাংলাদেশের জন্য আগামী ৫ বছরে ১৭ হাজার কোটি টাকা (১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) প্রয়োজন হবে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের (সিথ্রিইআর) উপদেষ্টা ড. আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্য খাতে ক্রমবর্ধমান চাপ বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও অর্থায়নে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। স্বাস্থ্য, পানি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এইচএনএপি দিকনির্দেশনা দেবে। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোর সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ের এ উদ্যোগকে সহায়তা দিতে আন্তর্জাতিক অভিযোজন অর্থায়নও প্রয়োজন, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় অনুদানের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া জরুরি।
গবেষণায় ৪টি উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় সরকারি অর্থায়ন থেকে ৩৮ কোটি ডলার, অন্যান্য খাতের স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অবদান থেকে ৩৬ কোটি ডলার, উন্নয়ন সহযোগীদের কর্মসূচি থেকে ৫২ কোটি ডলার এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নব্যবস্থা থেকে ১৪ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
এগুলো প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা, নিশ্চিত অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি নয়। একাধিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করা গেলে শুধু স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের ওপর নির্ভরতা কমবে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশীয় ও বিভিন্ন খাতের বিনিয়োগে মেটানো সম্ভব ৫৩ শতাংশ
দেশীয় অর্থায়নের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের কথা বলা হয়েছে। সরকারি প্রকল্প তৈরির সময় জলবায়ু সহনশীলতার বিষয়টি যুক্ত করা গেলে এসব অর্থ দিয়ে স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রস্তুতি এবং চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা সম্ভব হতে পারে।
স্বাস্থ্য খাতের বাইরের বিভিন্ন খাতের বিনিয়োগও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। উন্নত নিকাশিব্যবস্থা ও পয়োনিষ্কাশনের মাধ্যমে রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং বন্যাসহিষ্ণু অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখাও সহজ হবে।

গবেষণার প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশীয় অর্থায়ন ও অন্যান্য খাতের অবদান মিলিয়ে এইচএনএপির মোট অর্থায়ন চাহিদার প্রায় ৫৩ শতাংশ সংগ্রহ করা সম্ভব হতে পারে। তবে অন্যান্য খাতের বিনিয়োগের শুধু স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অংশটুকুই এ পরিকল্পনার অর্থায়ন হিসেবে গণনা করা হবে। একই অর্থ একাধিকবার হিসাব করা এড়াতে সুস্পষ্ট হিসাবপদ্ধতি অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কপ৩১ সামনে রেখে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সুযোগ
গবেষণায় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সবচেয়ে বড় একক উৎস হিসেবে প্রায় ৩৭ শতাংশ অর্থায়ন পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক, ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের কর্মসূচিগুলোকে এইচএনএপির অগ্রাধিকারের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে।
সম্ভাব্য অর্থায়নের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্য অবকাঠামো, রোগ পর্যবেক্ষণ, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি। প্রস্তাবিত অর্থায়নের মধ্যে সহজ শর্তের ঋণ ও বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এ অর্থায়ন নির্ভর করবে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমঝোতার ওপর। অন্যান্য কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে এইচএনএপিতে স্থানান্তর করা যাবে না।
এ ছাড়া গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, অ্যাডাপটেশন ফান্ড এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য তহবিলের (এলডিসিএফ) মাধ্যমে অর্থায়নের সম্ভাবনাও চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব তহবিলে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প প্রস্তাব দিয়ে রোগের আগাম সতর্কবার্তা, তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সম্পর্কে পরামর্শ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং উপকূলীয় ও বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষের অভিযোজন কার্যক্রমে সহায়তা চাওয়া যেতে পারে।
কপ৩১-এর আগে এ অর্থায়ন পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় রোগ প্রতিরোধ ও আগাম প্রস্তুতির মতো কার্যক্রমে অনুদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ, এসব কার্যক্রম থেকে সরাসরি আয় হয় না।
প্রস্তাবিত ১৪ কোটি ডলারের মধ্যে কতটা অনুদান পাওয়া সম্ভব হবে এবং এর বিপরীতে অন্য উৎস থেকে কত অর্থায়ন প্রয়োজন হবে, তা নির্ধারণে আরও প্রকল্প প্রস্তুতি ও মূল্যায়ন করতে হবে। একইসঙ্গে অন্যান্য উৎসের অর্থের সঙ্গে দ্বৈত হিসাব এড়ানোর বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
চারটি অগ্রাধিকার খাতে প্রয়োজন ৯৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার
এইচএনএপির বিনিয়োগ কাঠামোর চারটি উপাদানে মোট ৯৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার, অর্থাৎ পরিকল্পনার মোট অর্থায়ন চাহিদার ৬৯ শতাংশ প্রয়োজন হবে।
এর মধ্যে জলবায়ু সহনশীল ও কম কার্বন নিঃসরণকারী অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য ৩৫ কোটি ডলার; সমন্বিত ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কবার্তা ও নিঃসরণ পর্যবেক্ষণের জন্য ২৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার; জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী গড়ে তুলতে ২১ কোটি ডলার এবং নেতৃত্ব ও সুশাসন জোরদারে ১৪ কোটি ডলার প্রয়োজন হবে।

প্রস্তাবিত কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে বন্যা ও উপকূলীয় দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর উন্নয়ন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং দুর্যোগের সময় টিকাদান কার্যক্রম চালু রাখতে টিকা সংরক্ষণের শীতল সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে রোগ পর্যবেক্ষণব্যবস্থার সমন্বয় করা গেলে রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি আরও কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুত করা সম্ভব হবে।
সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টনে অর্থায়ন নিশ্চিত করার সুপারিশ
গবেষণায় স্বাস্থ্য খাতের নতুন উন্নয়ন প্রকল্পে জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যয় নির্ধারণ ও অর্থায়ন পরিকল্পনা তৈরির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন এবং জলবায়ু ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের হিসাব রাখতে সরকারের ‘আইবাস++’ হিসাবব্যবস্থায় সুনির্দিষ্ট কোড চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলে আবেদন করার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মাধ্যমে সমন্বয়েরও সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, পরিকল্পনা কমিশন জলবায়ু ও স্বাস্থ্যবিষয়ক মূল্যায়নে সহায়তা করতে পারে এবং বিভিন্ন খাতের বিনিয়োগের মধ্যে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অবদান চিহ্নিত করতে পারে।
বিদ্যমান অর্থের উৎস চিহ্নিত করা, উন্নয়ন সহযোগীদের অবদান নিয়ে সমঝোতা করা এবং সুস্পষ্ট সময়সীমা ও পরিমাপযোগ্য স্বাস্থ্যগত ফলাফলসহ প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা গেলে এ অর্থায়ন পরিকল্পনাকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করার পথ তৈরি হতে পারে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক স্তর থেকে অর্থায়ন পাওয়ার বড় সুযোগ আছে। কিন্তু যথাযথভাবে সেটি আনা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য সরকারি, বেসরকারি ও এনজিওগুলোর সমন্বয় জরুরি। ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
আলোচকরা স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্টদের জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকি নিয়ে প্রশিক্ষিত করার ওপর জোর দেন। এছাড়া শিক্ষা কারিকুলামে জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি যুক্ত করার পরামর্শ দেন।

জলবায়ুর স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় ১৪০ কোটি ডলার অর্থায়ন সম্ভব: গবেষণা
নিজস্ব প্রতিবেদক

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্য খাতে সৃষ্ট প্রভাব মোকাবিলায় দেশীয় অর্থায়ন, উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে বাংলাদেশ। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের (সি৩ইআর) এক প্রতিবেদনে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যবিষয়ক জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এইচএনএপি) ২০২৬-২০৩১ বাস্তবায়নে অর্থায়নের সম্ভাব্য উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১৪০ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে তীব্র তাপপ্রবাহ, জলবায়ু-সংবেদনশীল রোগ, অনিরাপদ পানি এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার মতো সমস্যা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের জন্য অর্থ সংগ্রহের পথও তুলে ধরা হয়েছে।
জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ইকবাল কবীর বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জাতীয় স্বাস্থ্য অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৬-৩০ বাস্তবায়নে বাংলাদেশের জন্য আগামী ৫ বছরে ১৭ হাজার কোটি টাকা (১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) প্রয়োজন হবে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের (সিথ্রিইআর) উপদেষ্টা ড. আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্য খাতে ক্রমবর্ধমান চাপ বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও অর্থায়নে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। স্বাস্থ্য, পানি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এইচএনএপি দিকনির্দেশনা দেবে। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোর সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ের এ উদ্যোগকে সহায়তা দিতে আন্তর্জাতিক অভিযোজন অর্থায়নও প্রয়োজন, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় অনুদানের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া জরুরি।
গবেষণায় ৪টি উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় সরকারি অর্থায়ন থেকে ৩৮ কোটি ডলার, অন্যান্য খাতের স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অবদান থেকে ৩৬ কোটি ডলার, উন্নয়ন সহযোগীদের কর্মসূচি থেকে ৫২ কোটি ডলার এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নব্যবস্থা থেকে ১৪ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
এগুলো প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা, নিশ্চিত অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি নয়। একাধিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করা গেলে শুধু স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের ওপর নির্ভরতা কমবে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশীয় ও বিভিন্ন খাতের বিনিয়োগে মেটানো সম্ভব ৫৩ শতাংশ
দেশীয় অর্থায়নের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের কথা বলা হয়েছে। সরকারি প্রকল্প তৈরির সময় জলবায়ু সহনশীলতার বিষয়টি যুক্ত করা গেলে এসব অর্থ দিয়ে স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রস্তুতি এবং চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা সম্ভব হতে পারে।
স্বাস্থ্য খাতের বাইরের বিভিন্ন খাতের বিনিয়োগও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। উন্নত নিকাশিব্যবস্থা ও পয়োনিষ্কাশনের মাধ্যমে রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং বন্যাসহিষ্ণু অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখাও সহজ হবে।

গবেষণার প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশীয় অর্থায়ন ও অন্যান্য খাতের অবদান মিলিয়ে এইচএনএপির মোট অর্থায়ন চাহিদার প্রায় ৫৩ শতাংশ সংগ্রহ করা সম্ভব হতে পারে। তবে অন্যান্য খাতের বিনিয়োগের শুধু স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অংশটুকুই এ পরিকল্পনার অর্থায়ন হিসেবে গণনা করা হবে। একই অর্থ একাধিকবার হিসাব করা এড়াতে সুস্পষ্ট হিসাবপদ্ধতি অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কপ৩১ সামনে রেখে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সুযোগ
গবেষণায় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সবচেয়ে বড় একক উৎস হিসেবে প্রায় ৩৭ শতাংশ অর্থায়ন পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক, ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের কর্মসূচিগুলোকে এইচএনএপির অগ্রাধিকারের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে।
সম্ভাব্য অর্থায়নের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্য অবকাঠামো, রোগ পর্যবেক্ষণ, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি। প্রস্তাবিত অর্থায়নের মধ্যে সহজ শর্তের ঋণ ও বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এ অর্থায়ন নির্ভর করবে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমঝোতার ওপর। অন্যান্য কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে এইচএনএপিতে স্থানান্তর করা যাবে না।
এ ছাড়া গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, অ্যাডাপটেশন ফান্ড এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য তহবিলের (এলডিসিএফ) মাধ্যমে অর্থায়নের সম্ভাবনাও চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব তহবিলে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প প্রস্তাব দিয়ে রোগের আগাম সতর্কবার্তা, তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সম্পর্কে পরামর্শ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং উপকূলীয় ও বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষের অভিযোজন কার্যক্রমে সহায়তা চাওয়া যেতে পারে।
কপ৩১-এর আগে এ অর্থায়ন পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় রোগ প্রতিরোধ ও আগাম প্রস্তুতির মতো কার্যক্রমে অনুদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ, এসব কার্যক্রম থেকে সরাসরি আয় হয় না।
প্রস্তাবিত ১৪ কোটি ডলারের মধ্যে কতটা অনুদান পাওয়া সম্ভব হবে এবং এর বিপরীতে অন্য উৎস থেকে কত অর্থায়ন প্রয়োজন হবে, তা নির্ধারণে আরও প্রকল্প প্রস্তুতি ও মূল্যায়ন করতে হবে। একইসঙ্গে অন্যান্য উৎসের অর্থের সঙ্গে দ্বৈত হিসাব এড়ানোর বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
চারটি অগ্রাধিকার খাতে প্রয়োজন ৯৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার
এইচএনএপির বিনিয়োগ কাঠামোর চারটি উপাদানে মোট ৯৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার, অর্থাৎ পরিকল্পনার মোট অর্থায়ন চাহিদার ৬৯ শতাংশ প্রয়োজন হবে।
এর মধ্যে জলবায়ু সহনশীল ও কম কার্বন নিঃসরণকারী অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য ৩৫ কোটি ডলার; সমন্বিত ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কবার্তা ও নিঃসরণ পর্যবেক্ষণের জন্য ২৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার; জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী গড়ে তুলতে ২১ কোটি ডলার এবং নেতৃত্ব ও সুশাসন জোরদারে ১৪ কোটি ডলার প্রয়োজন হবে।

প্রস্তাবিত কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে বন্যা ও উপকূলীয় দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর উন্নয়ন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং দুর্যোগের সময় টিকাদান কার্যক্রম চালু রাখতে টিকা সংরক্ষণের শীতল সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে রোগ পর্যবেক্ষণব্যবস্থার সমন্বয় করা গেলে রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি আরও কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুত করা সম্ভব হবে।
সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টনে অর্থায়ন নিশ্চিত করার সুপারিশ
গবেষণায় স্বাস্থ্য খাতের নতুন উন্নয়ন প্রকল্পে জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যয় নির্ধারণ ও অর্থায়ন পরিকল্পনা তৈরির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন এবং জলবায়ু ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের হিসাব রাখতে সরকারের ‘আইবাস++’ হিসাবব্যবস্থায় সুনির্দিষ্ট কোড চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলে আবেদন করার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মাধ্যমে সমন্বয়েরও সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, পরিকল্পনা কমিশন জলবায়ু ও স্বাস্থ্যবিষয়ক মূল্যায়নে সহায়তা করতে পারে এবং বিভিন্ন খাতের বিনিয়োগের মধ্যে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অবদান চিহ্নিত করতে পারে।
বিদ্যমান অর্থের উৎস চিহ্নিত করা, উন্নয়ন সহযোগীদের অবদান নিয়ে সমঝোতা করা এবং সুস্পষ্ট সময়সীমা ও পরিমাপযোগ্য স্বাস্থ্যগত ফলাফলসহ প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা গেলে এ অর্থায়ন পরিকল্পনাকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করার পথ তৈরি হতে পারে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক স্তর থেকে অর্থায়ন পাওয়ার বড় সুযোগ আছে। কিন্তু যথাযথভাবে সেটি আনা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য সরকারি, বেসরকারি ও এনজিওগুলোর সমন্বয় জরুরি। ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
আলোচকরা স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্টদের জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকি নিয়ে প্রশিক্ষিত করার ওপর জোর দেন। এছাড়া শিক্ষা কারিকুলামে জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি যুক্ত করার পরামর্শ দেন।

ঢাকায় তরুণ জলবায়ু নেতাদের সম্মেলন শুরু







