বিএনপির প্যাডে নাম থাকা ব্যক্তিরাই হয়ে গেলেন ‘সার ডিলার’

বিএনপির প্যাডে নাম থাকা ব্যক্তিরাই হয়ে গেলেন ‘সার ডিলার’
রংপুর সংবাদদাতা

রংপুরের পীরগাছায় সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, কোটি টাকার বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। দলীয় প্যাডে উপজেলা বিএনপির সভাপতি স্বাক্ষরিত তালিকায় নাম থাকা ব্যক্তিরাই ‘কৃষি সার ডিলার’ হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি।
ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই ৯ জনের নামের একটি তালিকা ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। ওই অভিযোগের তদন্ত শেষ না হতেই গত ১৭ সেপ্টেম্বর পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা স্বাক্ষরিত ‘ডিলার নিয়োগ-২০২৬ এর তথ্য’ শিরোনামের নতুন তালিকাটি সামনে আসে। এই তালিকায় বিএনপি, জামায়াত এমনকি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা ও তাদের স্বজনদের নামও রয়েছে।
তালিকায় পীরগাছার নয়টি ইউনিয়নের মোট ১৯ জনের নাম রয়েছে। এর মধ্যে তাম্বুলপুর ও পীরগাছা সদর ইউনিয়নে তিনজন করে ছয়জন এবং কান্দি ইউনিয়নে একজনের নাম দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কল্যাণী, পারুল, কৈকুড়ি, ছাওলা, ইটাকুমারী ও অন্নদানগর ইউনিয়নে দুজন করে মোট ১২ জনের নাম রয়েছে।
তালিকাটি যাচাই করে দেখা যায়, এতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্ত্রী, একজন ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতির মেয়ে, ইউনিয়ন বিএনপির এক সাধারণ সম্পাদকের শ্বশুর, সিনিয়র সহসভাপতির ছেলে এবং আরেক সাধারণ সম্পাদকের ফুফাতো ভাইয়ের নাম রয়েছে।
পীরগাছায় সার ডিলারের প্রাথমিক তালিকা
পীরগাছার তাম্বুলপুর ইউনিয়নের তালিকায় প্রথমে রয়েছে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নুরুল আমীনের মেয়ে মোছা. সুইটি বেগমের নাম। তিনি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেসের স্ত্রী। দ্বিতীয় নামটি ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ছগির আলীর ছেলে আব্দুল জলিলের। তৃতীয় নাম জাহেদুল ইসলামের, যিনি একই এলাকার আব্দুল আউয়ালের ছেলে এবং জামায়াতের কর্মী বলে পরিচিত।

পীরগাছা সদর ইউনিয়নের তালিকায় প্রথমে রয়েছে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্ত্রী মোছা. সুলতানা ফেরদৌসির নাম। দ্বিতীয় নামটি জাতীয় পার্টির উপজেলা সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আমির হোসেনের। ওই তালিকায় তৃতীয় নাম নাজমুল হুদার, যিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি রাঙ্গার ঘনিষ্ঠ সহচর।
কল্যাণী ইউনিয়ন থেকে তালিকায় থাকা দুই জন হলেন ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি জিকরুল আমিন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মো. তহিদুল ইসলাম। কান্দি ইউনিয়নে তালিকাভুক্ত একমাত্র ব্যক্তি আতাউর রহমান ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তার বড় ভাই আনিছুর রহমান ভুট্টু ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি।
পারুল ইউনিয়ন থেকে তালিকায় রয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন সরকার এবং সভাপতি রেজাউল ইসলাম। কৈকুড়ি ইউনিয়নে রয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মীর আফসার আলীর ছেলে মীর তৌফিক হাসান এবং ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মুনছুর আলী সরকার।
ছাওলা ইউনিয়নের ডিলারের তালিকায় রয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সহ-কোষাধ্যক্ষ মো. জাকির হোসেন এবং কৃষক দলের মিজানুর রহমান। ইটাকুমারী ইউনিয়নে বিএনপি সমর্থক ও কীটনাশক ব্যবসায়ী মো. মাহমুদুল হাসান এবং মো. আলিমুদ্দিনের নামও তালিকায় রয়েছে। আলিমুদ্দিনের ছোট জামাতা মাসুদ রানা ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং তিনি জাতীয় পার্টির উপজেলা সভাপতি মাহবুবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
অন্নদানগর ইউনিয়নের তালিকায় রয়েছেন জয়িতা আক্তার জিনির নাম। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমানের প্রথম স্ত্রীর মেয়ে। একই ইউনিয়নের দ্বিতীয় নাম মো. মাহাবুর রহমানের। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের ফুফাতো ভাই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতির স্বাক্ষর করা তালিকায় নাম থাকা ৯জনই ‘কৃষি সার ডিলার’ হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। গত ৭ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে এ তালিকা প্রকাশ করা হয়।
পীরগাছায় সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হলেন যারা
পারুল ইউনিয়নেও উপজেলা ও জেলা থেকে সুপারিশকৃত তালিকার ১ নম্বরে থাকা মো. আব্দুল মতিন সরকারের মেসার্স নুহা ট্রেডার্স সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছে। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।
ইটাকুমারী ইউনিয়ন থেকে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মধুরাম গ্রামের মরহুম ময়েন উদ্দিনের ছেলে মো. আলিমুদ্দিনকে সার ডিলার মনোনীত করা হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠানের নাম মেহেজেবিন ট্রেডার্স। আলিমুদ্দিনের ছোট জামাতা মাসুদ রানা ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।

অন্নদানগর ইউনিয়ন থেকে মনোনীত হয়েছে উপজেলা ও জেলা থেকে সুপারিশকৃত তালিকার প্রথমে থাকা ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জগজীবন এলাকার জয়িতা আক্তার জিনি। তার প্রতিষ্ঠানের নাম জয়িতা সার বিতান। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমানের প্রথম স্ত্রীর মেয়ে এবং দিনাজপুর সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
ছাওলা ইউনিয়নে সার ডিলারের জন্য মনোনীত হয়েছে জাকির হোসেনের মেসার্স আয়মান ট্রেডার্স। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সহকোষাধ্যক্ষ। বিএনপি সভাপতির স্বাক্ষরিত প্যাডে এবং উপজেলা ও জেলা থেকে সুপারিশকৃত তালিকায় তার নামও প্রথমে ছিল।
তাম্বুলপুর ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত সুইটি বেগম উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেসের স্ত্রী। তার প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স শামান্তা এণ্ড সিফা ট্রেডার্স।
কৈকুড়ি ইউনিয়ন থেকেও ১ নম্বর ক্রমিকে থাকা চৌধুরী রানী গ্রামের মীর তৌফিক হাসানকে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মীর আফসার আলীর ছেলে। তার প্রতিষ্ঠানের নাম মীর তৌফিক ট্রেডার্স।
কান্দি ইউনিয়ন থেকে মেসার্স সান ট্রেডার্সকে মনোনীত করা হয়েছে। এটি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের প্রতিষ্ঠান। তিনি ওই ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের তালুক কান্দি নিজপাড়া গ্রামের আব্দুল জলিলের ছেলে। তার বড় ভাই আনিছুর রহমান ভুট্টু ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি।
তবে সার ডিলার হিসেবে দলের লোকদের মনোনয়ন বা তাদের নাম তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম। তিনি দাবি করেছেন, সার ডিলার নিয়োগের জন্য তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কার্যালয় বা কৃষি অফিসে কোনও তালিকা দেননি। প্রতিবেদকের কাছে তার স্বাক্ষর করা তালিকা রয়েছে জানানো হলে তিনি বলেন, তালিকাটি না দেখে এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবেন না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াছমিনও জানান, উপজেলা বিএনপির সভাপতির দেওয়া কোনো তালিকা তিনি পাননি। তিনি বলেন, কমিটির মাধ্যমে তালিকা যাচাই-বাছাই করে প্রতি ইউনিয়নের জন্য নাম চূড়ান্ত করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জায়েদ ইমরুল মুজাক্কিন বলেন, উপজেলা বিএনপির সভাপতির পক্ষ থেকে তাকে তালিকা দেওয়া হয়নি। এ ধরনের তালিকা দেওয়ার সুযোগও নেই। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রতি ইউনিয়নে তিনজনের তালিকা তৈরি করে পাঠানো হয়েছে। ডিলার নিয়োগে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই তার জবাব দিতে হবে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শুরুতে ছিল ৯ জনের তালিকা
সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই নানা বিতর্ক এবং কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ থাকার পরও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি উপজেলা ও জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কমিটি। পীরগাছার ৯টি ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই প্রথম দিকে ৯ জনের নামের একটি তালিকা ছড়িয়ে পড়ে। এতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সম্পাদকের স্ত্রীর নাম ছিল।
একইসঙ্গে ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ১৫ লাখ থেকে ২৭ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনেরও অভিযোগ ওঠে। সর্বোচ্চ ২৭ লাখ টাকা উৎকোচ দিয়েছেন এমন অভিযোগ ওঠে কান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ফটোকার্ড, পোস্ট ও কথোপকথনের অডিও ছড়িয়ে পড়লেও টনক নড়েনি প্রশাসনের। উপরন্তু রাজনৈতিক চাপ আর সমঝোতায় প্রশাসনের নাকের ডগায় ছিল নানা বিতর্ক আর আলোচনা-সমালোচনা।
কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ
স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, উপজেলার ৯ ইউনিয়নের মধ্যে সার ডিলার নিয়োগের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, কল্যাণী ইউনিয়নে ১৫ লাখ, ইটাকুমারীতে ১৭ লাখ, অন্নদানগরে ১৫ লাখ, পারুলে ১৮ লাখ, কান্দিতে সর্বোচ্চ ২৭ লাখ, ছাওলায় ২৩ লাখ এবং কৈকুড়িতে ১৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। সাত ইউনিয়নের কথিত অর্থের হিসাব যোগ করলে দাঁড়ায় ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙা। তবে সহযোগী হিসেবে সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেসের নামও উঠে এসেছে।
স্থানীয় নেতা-কর্মীদের দাবি, ডিলার বাছাইয়ে ওই দুই নেতা প্রভাব বিস্তার করেছেন। তাদের অভিযোগ, পছন্দের প্রার্থীকে ডিলার করতে কোথাও অর্থ লেনদেন হয়েছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করা হয়েছে। এই সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছিলেন স্থানীয় বিএনপি নেতা জিয়াউর রহমান।
সারের ডিলার নিয়োগে টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়টি মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবি করে গত ২৫ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেস।

রংপুরের পীরগাছায় সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, কোটি টাকার বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। দলীয় প্যাডে উপজেলা বিএনপির সভাপতি স্বাক্ষরিত তালিকায় নাম থাকা ব্যক্তিরাই ‘কৃষি সার ডিলার’ হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি।
ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই ৯ জনের নামের একটি তালিকা ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। ওই অভিযোগের তদন্ত শেষ না হতেই গত ১৭ সেপ্টেম্বর পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা স্বাক্ষরিত ‘ডিলার নিয়োগ-২০২৬ এর তথ্য’ শিরোনামের নতুন তালিকাটি সামনে আসে। এই তালিকায় বিএনপি, জামায়াত এমনকি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা ও তাদের স্বজনদের নামও রয়েছে।
তালিকায় পীরগাছার নয়টি ইউনিয়নের মোট ১৯ জনের নাম রয়েছে। এর মধ্যে তাম্বুলপুর ও পীরগাছা সদর ইউনিয়নে তিনজন করে ছয়জন এবং কান্দি ইউনিয়নে একজনের নাম দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কল্যাণী, পারুল, কৈকুড়ি, ছাওলা, ইটাকুমারী ও অন্নদানগর ইউনিয়নে দুজন করে মোট ১২ জনের নাম রয়েছে।
তালিকাটি যাচাই করে দেখা যায়, এতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্ত্রী, একজন ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতির মেয়ে, ইউনিয়ন বিএনপির এক সাধারণ সম্পাদকের শ্বশুর, সিনিয়র সহসভাপতির ছেলে এবং আরেক সাধারণ সম্পাদকের ফুফাতো ভাইয়ের নাম রয়েছে।
পীরগাছায় সার ডিলারের প্রাথমিক তালিকা
পীরগাছার তাম্বুলপুর ইউনিয়নের তালিকায় প্রথমে রয়েছে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নুরুল আমীনের মেয়ে মোছা. সুইটি বেগমের নাম। তিনি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেসের স্ত্রী। দ্বিতীয় নামটি ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ছগির আলীর ছেলে আব্দুল জলিলের। তৃতীয় নাম জাহেদুল ইসলামের, যিনি একই এলাকার আব্দুল আউয়ালের ছেলে এবং জামায়াতের কর্মী বলে পরিচিত।

পীরগাছা সদর ইউনিয়নের তালিকায় প্রথমে রয়েছে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্ত্রী মোছা. সুলতানা ফেরদৌসির নাম। দ্বিতীয় নামটি জাতীয় পার্টির উপজেলা সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আমির হোসেনের। ওই তালিকায় তৃতীয় নাম নাজমুল হুদার, যিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি রাঙ্গার ঘনিষ্ঠ সহচর।
কল্যাণী ইউনিয়ন থেকে তালিকায় থাকা দুই জন হলেন ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি জিকরুল আমিন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মো. তহিদুল ইসলাম। কান্দি ইউনিয়নে তালিকাভুক্ত একমাত্র ব্যক্তি আতাউর রহমান ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তার বড় ভাই আনিছুর রহমান ভুট্টু ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি।
পারুল ইউনিয়ন থেকে তালিকায় রয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন সরকার এবং সভাপতি রেজাউল ইসলাম। কৈকুড়ি ইউনিয়নে রয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মীর আফসার আলীর ছেলে মীর তৌফিক হাসান এবং ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মুনছুর আলী সরকার।
ছাওলা ইউনিয়নের ডিলারের তালিকায় রয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সহ-কোষাধ্যক্ষ মো. জাকির হোসেন এবং কৃষক দলের মিজানুর রহমান। ইটাকুমারী ইউনিয়নে বিএনপি সমর্থক ও কীটনাশক ব্যবসায়ী মো. মাহমুদুল হাসান এবং মো. আলিমুদ্দিনের নামও তালিকায় রয়েছে। আলিমুদ্দিনের ছোট জামাতা মাসুদ রানা ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং তিনি জাতীয় পার্টির উপজেলা সভাপতি মাহবুবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
অন্নদানগর ইউনিয়নের তালিকায় রয়েছেন জয়িতা আক্তার জিনির নাম। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমানের প্রথম স্ত্রীর মেয়ে। একই ইউনিয়নের দ্বিতীয় নাম মো. মাহাবুর রহমানের। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের ফুফাতো ভাই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতির স্বাক্ষর করা তালিকায় নাম থাকা ৯জনই ‘কৃষি সার ডিলার’ হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। গত ৭ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে এ তালিকা প্রকাশ করা হয়।
পীরগাছায় সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হলেন যারা
পারুল ইউনিয়নেও উপজেলা ও জেলা থেকে সুপারিশকৃত তালিকার ১ নম্বরে থাকা মো. আব্দুল মতিন সরকারের মেসার্স নুহা ট্রেডার্স সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছে। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।
ইটাকুমারী ইউনিয়ন থেকে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মধুরাম গ্রামের মরহুম ময়েন উদ্দিনের ছেলে মো. আলিমুদ্দিনকে সার ডিলার মনোনীত করা হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠানের নাম মেহেজেবিন ট্রেডার্স। আলিমুদ্দিনের ছোট জামাতা মাসুদ রানা ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।

অন্নদানগর ইউনিয়ন থেকে মনোনীত হয়েছে উপজেলা ও জেলা থেকে সুপারিশকৃত তালিকার প্রথমে থাকা ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জগজীবন এলাকার জয়িতা আক্তার জিনি। তার প্রতিষ্ঠানের নাম জয়িতা সার বিতান। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমানের প্রথম স্ত্রীর মেয়ে এবং দিনাজপুর সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
ছাওলা ইউনিয়নে সার ডিলারের জন্য মনোনীত হয়েছে জাকির হোসেনের মেসার্স আয়মান ট্রেডার্স। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সহকোষাধ্যক্ষ। বিএনপি সভাপতির স্বাক্ষরিত প্যাডে এবং উপজেলা ও জেলা থেকে সুপারিশকৃত তালিকায় তার নামও প্রথমে ছিল।
তাম্বুলপুর ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত সুইটি বেগম উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেসের স্ত্রী। তার প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স শামান্তা এণ্ড সিফা ট্রেডার্স।
কৈকুড়ি ইউনিয়ন থেকেও ১ নম্বর ক্রমিকে থাকা চৌধুরী রানী গ্রামের মীর তৌফিক হাসানকে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মীর আফসার আলীর ছেলে। তার প্রতিষ্ঠানের নাম মীর তৌফিক ট্রেডার্স।
কান্দি ইউনিয়ন থেকে মেসার্স সান ট্রেডার্সকে মনোনীত করা হয়েছে। এটি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের প্রতিষ্ঠান। তিনি ওই ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের তালুক কান্দি নিজপাড়া গ্রামের আব্দুল জলিলের ছেলে। তার বড় ভাই আনিছুর রহমান ভুট্টু ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি।
তবে সার ডিলার হিসেবে দলের লোকদের মনোনয়ন বা তাদের নাম তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম। তিনি দাবি করেছেন, সার ডিলার নিয়োগের জন্য তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কার্যালয় বা কৃষি অফিসে কোনও তালিকা দেননি। প্রতিবেদকের কাছে তার স্বাক্ষর করা তালিকা রয়েছে জানানো হলে তিনি বলেন, তালিকাটি না দেখে এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবেন না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াছমিনও জানান, উপজেলা বিএনপির সভাপতির দেওয়া কোনো তালিকা তিনি পাননি। তিনি বলেন, কমিটির মাধ্যমে তালিকা যাচাই-বাছাই করে প্রতি ইউনিয়নের জন্য নাম চূড়ান্ত করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জায়েদ ইমরুল মুজাক্কিন বলেন, উপজেলা বিএনপির সভাপতির পক্ষ থেকে তাকে তালিকা দেওয়া হয়নি। এ ধরনের তালিকা দেওয়ার সুযোগও নেই। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রতি ইউনিয়নে তিনজনের তালিকা তৈরি করে পাঠানো হয়েছে। ডিলার নিয়োগে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই তার জবাব দিতে হবে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শুরুতে ছিল ৯ জনের তালিকা
সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই নানা বিতর্ক এবং কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ থাকার পরও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি উপজেলা ও জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কমিটি। পীরগাছার ৯টি ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই প্রথম দিকে ৯ জনের নামের একটি তালিকা ছড়িয়ে পড়ে। এতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সম্পাদকের স্ত্রীর নাম ছিল।
একইসঙ্গে ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ১৫ লাখ থেকে ২৭ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনেরও অভিযোগ ওঠে। সর্বোচ্চ ২৭ লাখ টাকা উৎকোচ দিয়েছেন এমন অভিযোগ ওঠে কান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ফটোকার্ড, পোস্ট ও কথোপকথনের অডিও ছড়িয়ে পড়লেও টনক নড়েনি প্রশাসনের। উপরন্তু রাজনৈতিক চাপ আর সমঝোতায় প্রশাসনের নাকের ডগায় ছিল নানা বিতর্ক আর আলোচনা-সমালোচনা।
কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ
স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, উপজেলার ৯ ইউনিয়নের মধ্যে সার ডিলার নিয়োগের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, কল্যাণী ইউনিয়নে ১৫ লাখ, ইটাকুমারীতে ১৭ লাখ, অন্নদানগরে ১৫ লাখ, পারুলে ১৮ লাখ, কান্দিতে সর্বোচ্চ ২৭ লাখ, ছাওলায় ২৩ লাখ এবং কৈকুড়িতে ১৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। সাত ইউনিয়নের কথিত অর্থের হিসাব যোগ করলে দাঁড়ায় ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙা। তবে সহযোগী হিসেবে সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেসের নামও উঠে এসেছে।
স্থানীয় নেতা-কর্মীদের দাবি, ডিলার বাছাইয়ে ওই দুই নেতা প্রভাব বিস্তার করেছেন। তাদের অভিযোগ, পছন্দের প্রার্থীকে ডিলার করতে কোথাও অর্থ লেনদেন হয়েছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করা হয়েছে। এই সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছিলেন স্থানীয় বিএনপি নেতা জিয়াউর রহমান।
সারের ডিলার নিয়োগে টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়টি মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবি করে গত ২৫ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেস।

বিএনপির প্যাডে নাম থাকা ব্যক্তিরাই হয়ে গেলেন ‘সার ডিলার’
রংপুর সংবাদদাতা

রংপুরের পীরগাছায় সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, কোটি টাকার বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। দলীয় প্যাডে উপজেলা বিএনপির সভাপতি স্বাক্ষরিত তালিকায় নাম থাকা ব্যক্তিরাই ‘কৃষি সার ডিলার’ হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি।
ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই ৯ জনের নামের একটি তালিকা ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। ওই অভিযোগের তদন্ত শেষ না হতেই গত ১৭ সেপ্টেম্বর পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা স্বাক্ষরিত ‘ডিলার নিয়োগ-২০২৬ এর তথ্য’ শিরোনামের নতুন তালিকাটি সামনে আসে। এই তালিকায় বিএনপি, জামায়াত এমনকি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা ও তাদের স্বজনদের নামও রয়েছে।
তালিকায় পীরগাছার নয়টি ইউনিয়নের মোট ১৯ জনের নাম রয়েছে। এর মধ্যে তাম্বুলপুর ও পীরগাছা সদর ইউনিয়নে তিনজন করে ছয়জন এবং কান্দি ইউনিয়নে একজনের নাম দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কল্যাণী, পারুল, কৈকুড়ি, ছাওলা, ইটাকুমারী ও অন্নদানগর ইউনিয়নে দুজন করে মোট ১২ জনের নাম রয়েছে।
তালিকাটি যাচাই করে দেখা যায়, এতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্ত্রী, একজন ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতির মেয়ে, ইউনিয়ন বিএনপির এক সাধারণ সম্পাদকের শ্বশুর, সিনিয়র সহসভাপতির ছেলে এবং আরেক সাধারণ সম্পাদকের ফুফাতো ভাইয়ের নাম রয়েছে।
পীরগাছায় সার ডিলারের প্রাথমিক তালিকা
পীরগাছার তাম্বুলপুর ইউনিয়নের তালিকায় প্রথমে রয়েছে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নুরুল আমীনের মেয়ে মোছা. সুইটি বেগমের নাম। তিনি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেসের স্ত্রী। দ্বিতীয় নামটি ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ছগির আলীর ছেলে আব্দুল জলিলের। তৃতীয় নাম জাহেদুল ইসলামের, যিনি একই এলাকার আব্দুল আউয়ালের ছেলে এবং জামায়াতের কর্মী বলে পরিচিত।

পীরগাছা সদর ইউনিয়নের তালিকায় প্রথমে রয়েছে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্ত্রী মোছা. সুলতানা ফেরদৌসির নাম। দ্বিতীয় নামটি জাতীয় পার্টির উপজেলা সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আমির হোসেনের। ওই তালিকায় তৃতীয় নাম নাজমুল হুদার, যিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি রাঙ্গার ঘনিষ্ঠ সহচর।
কল্যাণী ইউনিয়ন থেকে তালিকায় থাকা দুই জন হলেন ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি জিকরুল আমিন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মো. তহিদুল ইসলাম। কান্দি ইউনিয়নে তালিকাভুক্ত একমাত্র ব্যক্তি আতাউর রহমান ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তার বড় ভাই আনিছুর রহমান ভুট্টু ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি।
পারুল ইউনিয়ন থেকে তালিকায় রয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন সরকার এবং সভাপতি রেজাউল ইসলাম। কৈকুড়ি ইউনিয়নে রয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মীর আফসার আলীর ছেলে মীর তৌফিক হাসান এবং ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মুনছুর আলী সরকার।
ছাওলা ইউনিয়নের ডিলারের তালিকায় রয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সহ-কোষাধ্যক্ষ মো. জাকির হোসেন এবং কৃষক দলের মিজানুর রহমান। ইটাকুমারী ইউনিয়নে বিএনপি সমর্থক ও কীটনাশক ব্যবসায়ী মো. মাহমুদুল হাসান এবং মো. আলিমুদ্দিনের নামও তালিকায় রয়েছে। আলিমুদ্দিনের ছোট জামাতা মাসুদ রানা ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং তিনি জাতীয় পার্টির উপজেলা সভাপতি মাহবুবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
অন্নদানগর ইউনিয়নের তালিকায় রয়েছেন জয়িতা আক্তার জিনির নাম। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমানের প্রথম স্ত্রীর মেয়ে। একই ইউনিয়নের দ্বিতীয় নাম মো. মাহাবুর রহমানের। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের ফুফাতো ভাই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতির স্বাক্ষর করা তালিকায় নাম থাকা ৯জনই ‘কৃষি সার ডিলার’ হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। গত ৭ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে এ তালিকা প্রকাশ করা হয়।
পীরগাছায় সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হলেন যারা
পারুল ইউনিয়নেও উপজেলা ও জেলা থেকে সুপারিশকৃত তালিকার ১ নম্বরে থাকা মো. আব্দুল মতিন সরকারের মেসার্স নুহা ট্রেডার্স সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছে। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।
ইটাকুমারী ইউনিয়ন থেকে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মধুরাম গ্রামের মরহুম ময়েন উদ্দিনের ছেলে মো. আলিমুদ্দিনকে সার ডিলার মনোনীত করা হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠানের নাম মেহেজেবিন ট্রেডার্স। আলিমুদ্দিনের ছোট জামাতা মাসুদ রানা ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।

অন্নদানগর ইউনিয়ন থেকে মনোনীত হয়েছে উপজেলা ও জেলা থেকে সুপারিশকৃত তালিকার প্রথমে থাকা ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জগজীবন এলাকার জয়িতা আক্তার জিনি। তার প্রতিষ্ঠানের নাম জয়িতা সার বিতান। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমানের প্রথম স্ত্রীর মেয়ে এবং দিনাজপুর সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
ছাওলা ইউনিয়নে সার ডিলারের জন্য মনোনীত হয়েছে জাকির হোসেনের মেসার্স আয়মান ট্রেডার্স। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সহকোষাধ্যক্ষ। বিএনপি সভাপতির স্বাক্ষরিত প্যাডে এবং উপজেলা ও জেলা থেকে সুপারিশকৃত তালিকায় তার নামও প্রথমে ছিল।
তাম্বুলপুর ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত সুইটি বেগম উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেসের স্ত্রী। তার প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স শামান্তা এণ্ড সিফা ট্রেডার্স।
কৈকুড়ি ইউনিয়ন থেকেও ১ নম্বর ক্রমিকে থাকা চৌধুরী রানী গ্রামের মীর তৌফিক হাসানকে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মীর আফসার আলীর ছেলে। তার প্রতিষ্ঠানের নাম মীর তৌফিক ট্রেডার্স।
কান্দি ইউনিয়ন থেকে মেসার্স সান ট্রেডার্সকে মনোনীত করা হয়েছে। এটি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের প্রতিষ্ঠান। তিনি ওই ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের তালুক কান্দি নিজপাড়া গ্রামের আব্দুল জলিলের ছেলে। তার বড় ভাই আনিছুর রহমান ভুট্টু ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি।
তবে সার ডিলার হিসেবে দলের লোকদের মনোনয়ন বা তাদের নাম তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম। তিনি দাবি করেছেন, সার ডিলার নিয়োগের জন্য তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কার্যালয় বা কৃষি অফিসে কোনও তালিকা দেননি। প্রতিবেদকের কাছে তার স্বাক্ষর করা তালিকা রয়েছে জানানো হলে তিনি বলেন, তালিকাটি না দেখে এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবেন না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াছমিনও জানান, উপজেলা বিএনপির সভাপতির দেওয়া কোনো তালিকা তিনি পাননি। তিনি বলেন, কমিটির মাধ্যমে তালিকা যাচাই-বাছাই করে প্রতি ইউনিয়নের জন্য নাম চূড়ান্ত করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জায়েদ ইমরুল মুজাক্কিন বলেন, উপজেলা বিএনপির সভাপতির পক্ষ থেকে তাকে তালিকা দেওয়া হয়নি। এ ধরনের তালিকা দেওয়ার সুযোগও নেই। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রতি ইউনিয়নে তিনজনের তালিকা তৈরি করে পাঠানো হয়েছে। ডিলার নিয়োগে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই তার জবাব দিতে হবে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শুরুতে ছিল ৯ জনের তালিকা
সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই নানা বিতর্ক এবং কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ থাকার পরও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি উপজেলা ও জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কমিটি। পীরগাছার ৯টি ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই প্রথম দিকে ৯ জনের নামের একটি তালিকা ছড়িয়ে পড়ে। এতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সম্পাদকের স্ত্রীর নাম ছিল।
একইসঙ্গে ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ১৫ লাখ থেকে ২৭ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনেরও অভিযোগ ওঠে। সর্বোচ্চ ২৭ লাখ টাকা উৎকোচ দিয়েছেন এমন অভিযোগ ওঠে কান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ফটোকার্ড, পোস্ট ও কথোপকথনের অডিও ছড়িয়ে পড়লেও টনক নড়েনি প্রশাসনের। উপরন্তু রাজনৈতিক চাপ আর সমঝোতায় প্রশাসনের নাকের ডগায় ছিল নানা বিতর্ক আর আলোচনা-সমালোচনা।
কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ
স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, উপজেলার ৯ ইউনিয়নের মধ্যে সার ডিলার নিয়োগের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, কল্যাণী ইউনিয়নে ১৫ লাখ, ইটাকুমারীতে ১৭ লাখ, অন্নদানগরে ১৫ লাখ, পারুলে ১৮ লাখ, কান্দিতে সর্বোচ্চ ২৭ লাখ, ছাওলায় ২৩ লাখ এবং কৈকুড়িতে ১৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। সাত ইউনিয়নের কথিত অর্থের হিসাব যোগ করলে দাঁড়ায় ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙা। তবে সহযোগী হিসেবে সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেসের নামও উঠে এসেছে।
স্থানীয় নেতা-কর্মীদের দাবি, ডিলার বাছাইয়ে ওই দুই নেতা প্রভাব বিস্তার করেছেন। তাদের অভিযোগ, পছন্দের প্রার্থীকে ডিলার করতে কোথাও অর্থ লেনদেন হয়েছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করা হয়েছে। এই সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছিলেন স্থানীয় বিএনপি নেতা জিয়াউর রহমান।
সারের ডিলার নিয়োগে টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়টি মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবি করে গত ২৫ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেস।









