লক্ষ্মীপুরে ৫৭ সার ডিলারের ৪৫ জনই বিএনপি নেতা-কর্মী

লক্ষ্মীপুরে ৫৭ সার ডিলারের ৪৫ জনই বিএনপি নেতা-কর্মী
সিজেডএন ডেস্ক

লক্ষ্মীপুরে নতুন করে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত ৫৭ জনের মধ্যে ৪৫ জন বিএনপি ও দলটির সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের আগে সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা না থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অনেক আবেদনকারী ডিলারশিপ পাননি। এ নিয়ে জেলায় অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিলার নিয়োগের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মনোনীত ব্যক্তিরা এবং বিএনপির নেতারা।
জেলায় ৫৮টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভার জন্য সার ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। গত ১০ সেপ্টেম্বর আবেদন গ্রহণ শেষ হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মোট ৩৩৬টি আবেদন জমা পড়ে। পরে গত ৭ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখা থেকে ৫৭ জনকে ডিলার হিসেবে মনোনীত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মনোনীত ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৫ জন বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী। তাদের কেউ দলীয় পদে রয়েছেন, কেউ সক্রিয় কর্মী। কয়েকজনের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের পারিবারিক সম্পর্কও রয়েছে। অন্যদিকে, বাদ পড়া আবেদনকারীদের মধ্যেও বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি আছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, দলীয় পরিচয় ও প্রভাবের কারণে নতুন অনেক আবেদনকারী ডিলারশিপ পেয়েছেন। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সার বিক্রি করে আসা ব্যবসায়ীদের অনেকে বাদ পড়েছেন। তবে মনোনীত ব্যক্তিদের কেউ কেউ বলছেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে নিয়ম মেনেই তারা নির্বাচিত হয়েছেন।
নীতিমালায় পুরোনো ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার
সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালায় আবেদনকারীর আর্থিক সক্ষমতা, গুদাম ও ব্যবসায়িক যোগ্যতার শর্ত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌরসভায় নিজস্ব অথবা ভাড়া করা অন্তত ২৫ মেট্রিক টন সার সংরক্ষণের উপযোগী গুদাম থাকতে হবে। গুদামের মেঝে পাকা হতে হবে এবং সেটি স্বাভাবিক বন্যার পানির স্তরের ওপরে থাকতে হবে।
গুদামে খাদ্যপণ্য, রেস্তোরাঁর সামগ্রী, গবাদিপশু ও মাছের খাবার কিংবা সবজি রাখা যাবে না। একই স্থানে বীজ সংরক্ষণও নিষিদ্ধ। এ ছাড়া আবেদনকারীকে ব্যাংকের অন্তত পাঁচ লাখ টাকার সাম্প্রতিক সচ্ছলতার সনদ জমা দিতে হবে। নীতিমালায় আগে থেকেই সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
রাজনৈতিক পদে থাকা একাধিক ব্যক্তি ডিলার
রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন স্থানীয় বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল আজিজ বাদশা। তার প্রতিষ্ঠান মেসার্স গাজী এন্টারপ্রাইজ আগে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল না বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
রামগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন ওরফে পলাশের প্রতিষ্ঠান মেসার্স ফাল্গুনী এন্টারপ্রাইজও ডিলারশিপ পেয়েছে। রায়পুরের কেরোয়া ইউনিয়নে মেসার্স হাসিনা এন্টারপ্রাইজের মালিক ও উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মেহেদী হাসান আইনানকে মনোনীত করা হয়েছে। বামনী ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আমির হোসেন ওরফে ছুটু। তাদের কয়েকজনের আগে সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা ছিল না বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
উত্তর চর আবাবিল ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মাসুদ মিয়া। চরমোহনা ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি ফাহিম ভূঁইয়া। লক্ষ্মীপুর সদরের দালাল বাজার ইউনিয়নে মেসার্স সততা ট্রেডার্সের মালিক জাকির হোসেন ডিলারশিপ পেয়েছেন। তিনি ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি। তার প্রতিষ্ঠান মূলত রড, সিমেন্ট ও নারকেলের ব্যবসা করে।
রামগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. বিল্লাল পাটোয়ারী। করপাড়া ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আহসান হাবিবের প্রতিষ্ঠান এস বি ট্রেডার্স। ভোলাকোট ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাফেজ আহম্মদ।
কমলনগর উপজেলার সাহেবেরহাট ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন ইয়ামিন ট্রেডার্সের মো. ইসমাইল। তিনি ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক হেলাল উদ্দিনের ভাই। চর মার্টিন ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছেন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব মো. গিয়াস উদ্দিন।
চর ফলকন ইউনিয়নে মনোনীত মাহবুবুর রহমান উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরীর আত্মীয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পাটারীরহাট ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন তার চাচাতো ভাই লোকমান হোসেন পাটারী। হাজিরহাট ইউনিয়নে ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইসমাইল হোসেন। চর কাদিরা ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বোরহান উদ্দিনের ছোট ভাই হেলাল উদ্দিন।
দীর্ঘদিন সার বিক্রি করেও ডিলারশিপ পাননি
চন্দ্রগঞ্জ বাজারে ২০০২ সাল থেকে সার বিক্রি করছেন মো. শোভন। এবার ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেও তিনি মনোনীত হননি। শোভনের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় নিয়ম মেনে আবেদন করার পরও দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা তার কাজে আসেনি।
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সারের ব্যবসা করেও ডিলারশিপ পাইনি। সব নিয়মকানুন মেনে আবেদন করেছি। কিন্তু আমার রাজনৈতিক পরিচয় না থাকায় ডিলার হতে পারলাম না।’
চর কাদিরা ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহেদ হাওলাদারও দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তিনিও ডিলার হওয়ার আবেদন করেছিলেন, কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় তার নাম নেই।
শাহেদ বলেন, ‘নীতিমালায় আগে থেকে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা রয়েছে। আমি এক যুগ ধরে এলাকায় সার বিক্রি করছি। অথচ আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এমন একজনকে ডিলার করা হয়েছে, যিনি আগে কখনো সার ব্যবসা করেননি। বিষয়টি হতাশাজনক।’
কমলনগর উপজেলার চর মার্টিন ইউনিয়নে ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেছিলেন ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবদলের সদস্য তারেক রহমান ওরফে রকি। তার দাবি, তাদের পরিবার প্রায় ৫০ বছর ধরে সার ও কীটনাশকের ব্যবসা করছে। তাদের প্রতিষ্ঠান আগে সার ডিলার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সেই ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ‘যাদের ডিলার করা হয়েছে, তাদের অনেকের গুদাম নেই, সার বিক্রির অভিজ্ঞতাও নেই। অথচ প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হয়েছেন।’ তিনি অভিযোগ করেন, কমলনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরী অর্থের বিনিময়ে ডিলার নিয়োগের ব্যবস্থা করেছেন।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নুরুল হুদা চৌধুরী। তার বক্তব্য, ডিলার নিয়োগে বিএনপি কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। সবাই নিজ নিজ যোগ্যতায় মনোনীত হয়েছেন।
নুরুল হুদা চৌধুরী বলেন, ‘পাটারীরহাট ইউনিয়নের লোকমান হোসেন আমার দূরসম্পর্কের চাচাতো ভাই। চর ফলকন ইউনিয়নের মাহবুবুর রহমানকে আমার ভাগনে বলা হলেও তা সত্য নয়। তিনি আগে ছাত্রদল করতেন, এখন যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদেরও প্রত্যাশা ছিল, নীতিমালা অনুযায়ী আগে থেকে যাঁরা সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তারাই ডিলার নিয়োগে অগ্রাধিকার পাবেন।’
মনোনীতদের দাবি, যোগ্যতা দিয়েই পেয়েছেন ডিলারশিপ
রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিলার নিয়োগের অভিযোগ মানতে নারাজ মনোনীত ব্যক্তিরা। দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের ডিলার আমিনুল আজিজ বাদশা বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নয়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েই তিনি মনোনীত হয়েছেন।
রামগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন ওরফে পলাশের দাবি, ডিলারশিপ পেতে তিনি কোনো রাজনৈতিক তদবির করেননি। বামনী ইউনিয়নের আমির হোসেন ওরফে ছুটু বলেন, আগে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা করলেও এবারই প্রথম সার ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন। নিজের যোগ্যতার ভিত্তিতেই তিনি মনোনীত হয়েছেন বলে দাবি তার।
কমলনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে তাকে মনোনীত করেছে। তবে তিনি আগে কখনো সার ব্যবসা করেননি বলে জানান।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বশিকপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবালের ভাষ্য, তার ইউনিয়নে তিনি ছাড়া অন্য কেউ আবেদন করেননি। এ কারণে সার্বিক বিবেচনায় তাঁকে ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে।
তালিকা চূড়ান্ত করেছে মন্ত্রণালয়
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও জেলা সার এবং বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব জহির আহমেদ বলেন, তালিকায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সংখ্যা বেশি, এমন তথ্য তিনিও পেয়েছেন। তার ভাষ্য, উপজেলা পর্যায়ের সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি আবেদন যাচাই করে সুপারিশসহ তালিকা পাঠিয়েছিল। পরে সেটি কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় যাচাই শেষে চূড়ান্ত তালিকা পাঠিয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. হাছিবুর রহমান বলেন, গত ১৭ বছরে দলের নেতা-কর্মীরা সার ডিলারশিপসহ বিভিন্ন ব্যবসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এখন তারা ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত হতে আবেদন করছেন।
তিনি বলেন, ‘সবাই নিয়ম মেনে আবেদন করেছেন। ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে দলের কোনো প্রভাব ছিল না।’

লক্ষ্মীপুরে নতুন করে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত ৫৭ জনের মধ্যে ৪৫ জন বিএনপি ও দলটির সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের আগে সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা না থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অনেক আবেদনকারী ডিলারশিপ পাননি। এ নিয়ে জেলায় অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিলার নিয়োগের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মনোনীত ব্যক্তিরা এবং বিএনপির নেতারা।
জেলায় ৫৮টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভার জন্য সার ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। গত ১০ সেপ্টেম্বর আবেদন গ্রহণ শেষ হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মোট ৩৩৬টি আবেদন জমা পড়ে। পরে গত ৭ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখা থেকে ৫৭ জনকে ডিলার হিসেবে মনোনীত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মনোনীত ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৫ জন বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী। তাদের কেউ দলীয় পদে রয়েছেন, কেউ সক্রিয় কর্মী। কয়েকজনের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের পারিবারিক সম্পর্কও রয়েছে। অন্যদিকে, বাদ পড়া আবেদনকারীদের মধ্যেও বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি আছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, দলীয় পরিচয় ও প্রভাবের কারণে নতুন অনেক আবেদনকারী ডিলারশিপ পেয়েছেন। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সার বিক্রি করে আসা ব্যবসায়ীদের অনেকে বাদ পড়েছেন। তবে মনোনীত ব্যক্তিদের কেউ কেউ বলছেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে নিয়ম মেনেই তারা নির্বাচিত হয়েছেন।
নীতিমালায় পুরোনো ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার
সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালায় আবেদনকারীর আর্থিক সক্ষমতা, গুদাম ও ব্যবসায়িক যোগ্যতার শর্ত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌরসভায় নিজস্ব অথবা ভাড়া করা অন্তত ২৫ মেট্রিক টন সার সংরক্ষণের উপযোগী গুদাম থাকতে হবে। গুদামের মেঝে পাকা হতে হবে এবং সেটি স্বাভাবিক বন্যার পানির স্তরের ওপরে থাকতে হবে।
গুদামে খাদ্যপণ্য, রেস্তোরাঁর সামগ্রী, গবাদিপশু ও মাছের খাবার কিংবা সবজি রাখা যাবে না। একই স্থানে বীজ সংরক্ষণও নিষিদ্ধ। এ ছাড়া আবেদনকারীকে ব্যাংকের অন্তত পাঁচ লাখ টাকার সাম্প্রতিক সচ্ছলতার সনদ জমা দিতে হবে। নীতিমালায় আগে থেকেই সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
রাজনৈতিক পদে থাকা একাধিক ব্যক্তি ডিলার
রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন স্থানীয় বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল আজিজ বাদশা। তার প্রতিষ্ঠান মেসার্স গাজী এন্টারপ্রাইজ আগে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল না বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
রামগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন ওরফে পলাশের প্রতিষ্ঠান মেসার্স ফাল্গুনী এন্টারপ্রাইজও ডিলারশিপ পেয়েছে। রায়পুরের কেরোয়া ইউনিয়নে মেসার্স হাসিনা এন্টারপ্রাইজের মালিক ও উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মেহেদী হাসান আইনানকে মনোনীত করা হয়েছে। বামনী ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আমির হোসেন ওরফে ছুটু। তাদের কয়েকজনের আগে সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা ছিল না বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
উত্তর চর আবাবিল ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মাসুদ মিয়া। চরমোহনা ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি ফাহিম ভূঁইয়া। লক্ষ্মীপুর সদরের দালাল বাজার ইউনিয়নে মেসার্স সততা ট্রেডার্সের মালিক জাকির হোসেন ডিলারশিপ পেয়েছেন। তিনি ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি। তার প্রতিষ্ঠান মূলত রড, সিমেন্ট ও নারকেলের ব্যবসা করে।
রামগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. বিল্লাল পাটোয়ারী। করপাড়া ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আহসান হাবিবের প্রতিষ্ঠান এস বি ট্রেডার্স। ভোলাকোট ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাফেজ আহম্মদ।
কমলনগর উপজেলার সাহেবেরহাট ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন ইয়ামিন ট্রেডার্সের মো. ইসমাইল। তিনি ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক হেলাল উদ্দিনের ভাই। চর মার্টিন ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছেন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব মো. গিয়াস উদ্দিন।
চর ফলকন ইউনিয়নে মনোনীত মাহবুবুর রহমান উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরীর আত্মীয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পাটারীরহাট ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন তার চাচাতো ভাই লোকমান হোসেন পাটারী। হাজিরহাট ইউনিয়নে ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইসমাইল হোসেন। চর কাদিরা ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বোরহান উদ্দিনের ছোট ভাই হেলাল উদ্দিন।
দীর্ঘদিন সার বিক্রি করেও ডিলারশিপ পাননি
চন্দ্রগঞ্জ বাজারে ২০০২ সাল থেকে সার বিক্রি করছেন মো. শোভন। এবার ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেও তিনি মনোনীত হননি। শোভনের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় নিয়ম মেনে আবেদন করার পরও দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা তার কাজে আসেনি।
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সারের ব্যবসা করেও ডিলারশিপ পাইনি। সব নিয়মকানুন মেনে আবেদন করেছি। কিন্তু আমার রাজনৈতিক পরিচয় না থাকায় ডিলার হতে পারলাম না।’
চর কাদিরা ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহেদ হাওলাদারও দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তিনিও ডিলার হওয়ার আবেদন করেছিলেন, কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় তার নাম নেই।
শাহেদ বলেন, ‘নীতিমালায় আগে থেকে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা রয়েছে। আমি এক যুগ ধরে এলাকায় সার বিক্রি করছি। অথচ আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এমন একজনকে ডিলার করা হয়েছে, যিনি আগে কখনো সার ব্যবসা করেননি। বিষয়টি হতাশাজনক।’
কমলনগর উপজেলার চর মার্টিন ইউনিয়নে ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেছিলেন ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবদলের সদস্য তারেক রহমান ওরফে রকি। তার দাবি, তাদের পরিবার প্রায় ৫০ বছর ধরে সার ও কীটনাশকের ব্যবসা করছে। তাদের প্রতিষ্ঠান আগে সার ডিলার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সেই ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ‘যাদের ডিলার করা হয়েছে, তাদের অনেকের গুদাম নেই, সার বিক্রির অভিজ্ঞতাও নেই। অথচ প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হয়েছেন।’ তিনি অভিযোগ করেন, কমলনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরী অর্থের বিনিময়ে ডিলার নিয়োগের ব্যবস্থা করেছেন।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নুরুল হুদা চৌধুরী। তার বক্তব্য, ডিলার নিয়োগে বিএনপি কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। সবাই নিজ নিজ যোগ্যতায় মনোনীত হয়েছেন।
নুরুল হুদা চৌধুরী বলেন, ‘পাটারীরহাট ইউনিয়নের লোকমান হোসেন আমার দূরসম্পর্কের চাচাতো ভাই। চর ফলকন ইউনিয়নের মাহবুবুর রহমানকে আমার ভাগনে বলা হলেও তা সত্য নয়। তিনি আগে ছাত্রদল করতেন, এখন যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদেরও প্রত্যাশা ছিল, নীতিমালা অনুযায়ী আগে থেকে যাঁরা সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তারাই ডিলার নিয়োগে অগ্রাধিকার পাবেন।’
মনোনীতদের দাবি, যোগ্যতা দিয়েই পেয়েছেন ডিলারশিপ
রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিলার নিয়োগের অভিযোগ মানতে নারাজ মনোনীত ব্যক্তিরা। দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের ডিলার আমিনুল আজিজ বাদশা বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নয়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েই তিনি মনোনীত হয়েছেন।
রামগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন ওরফে পলাশের দাবি, ডিলারশিপ পেতে তিনি কোনো রাজনৈতিক তদবির করেননি। বামনী ইউনিয়নের আমির হোসেন ওরফে ছুটু বলেন, আগে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা করলেও এবারই প্রথম সার ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন। নিজের যোগ্যতার ভিত্তিতেই তিনি মনোনীত হয়েছেন বলে দাবি তার।
কমলনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে তাকে মনোনীত করেছে। তবে তিনি আগে কখনো সার ব্যবসা করেননি বলে জানান।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বশিকপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবালের ভাষ্য, তার ইউনিয়নে তিনি ছাড়া অন্য কেউ আবেদন করেননি। এ কারণে সার্বিক বিবেচনায় তাঁকে ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে।
তালিকা চূড়ান্ত করেছে মন্ত্রণালয়
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও জেলা সার এবং বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব জহির আহমেদ বলেন, তালিকায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সংখ্যা বেশি, এমন তথ্য তিনিও পেয়েছেন। তার ভাষ্য, উপজেলা পর্যায়ের সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি আবেদন যাচাই করে সুপারিশসহ তালিকা পাঠিয়েছিল। পরে সেটি কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় যাচাই শেষে চূড়ান্ত তালিকা পাঠিয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. হাছিবুর রহমান বলেন, গত ১৭ বছরে দলের নেতা-কর্মীরা সার ডিলারশিপসহ বিভিন্ন ব্যবসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এখন তারা ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত হতে আবেদন করছেন।
তিনি বলেন, ‘সবাই নিয়ম মেনে আবেদন করেছেন। ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে দলের কোনো প্রভাব ছিল না।’

লক্ষ্মীপুরে ৫৭ সার ডিলারের ৪৫ জনই বিএনপি নেতা-কর্মী
সিজেডএন ডেস্ক

লক্ষ্মীপুরে নতুন করে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত ৫৭ জনের মধ্যে ৪৫ জন বিএনপি ও দলটির সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের আগে সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা না থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অনেক আবেদনকারী ডিলারশিপ পাননি। এ নিয়ে জেলায় অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিলার নিয়োগের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মনোনীত ব্যক্তিরা এবং বিএনপির নেতারা।
জেলায় ৫৮টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভার জন্য সার ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। গত ১০ সেপ্টেম্বর আবেদন গ্রহণ শেষ হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মোট ৩৩৬টি আবেদন জমা পড়ে। পরে গত ৭ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখা থেকে ৫৭ জনকে ডিলার হিসেবে মনোনীত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মনোনীত ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৫ জন বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী। তাদের কেউ দলীয় পদে রয়েছেন, কেউ সক্রিয় কর্মী। কয়েকজনের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের পারিবারিক সম্পর্কও রয়েছে। অন্যদিকে, বাদ পড়া আবেদনকারীদের মধ্যেও বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি আছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, দলীয় পরিচয় ও প্রভাবের কারণে নতুন অনেক আবেদনকারী ডিলারশিপ পেয়েছেন। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সার বিক্রি করে আসা ব্যবসায়ীদের অনেকে বাদ পড়েছেন। তবে মনোনীত ব্যক্তিদের কেউ কেউ বলছেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে নিয়ম মেনেই তারা নির্বাচিত হয়েছেন।
নীতিমালায় পুরোনো ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার
সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালায় আবেদনকারীর আর্থিক সক্ষমতা, গুদাম ও ব্যবসায়িক যোগ্যতার শর্ত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌরসভায় নিজস্ব অথবা ভাড়া করা অন্তত ২৫ মেট্রিক টন সার সংরক্ষণের উপযোগী গুদাম থাকতে হবে। গুদামের মেঝে পাকা হতে হবে এবং সেটি স্বাভাবিক বন্যার পানির স্তরের ওপরে থাকতে হবে।
গুদামে খাদ্যপণ্য, রেস্তোরাঁর সামগ্রী, গবাদিপশু ও মাছের খাবার কিংবা সবজি রাখা যাবে না। একই স্থানে বীজ সংরক্ষণও নিষিদ্ধ। এ ছাড়া আবেদনকারীকে ব্যাংকের অন্তত পাঁচ লাখ টাকার সাম্প্রতিক সচ্ছলতার সনদ জমা দিতে হবে। নীতিমালায় আগে থেকেই সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
রাজনৈতিক পদে থাকা একাধিক ব্যক্তি ডিলার
রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন স্থানীয় বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল আজিজ বাদশা। তার প্রতিষ্ঠান মেসার্স গাজী এন্টারপ্রাইজ আগে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল না বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
রামগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন ওরফে পলাশের প্রতিষ্ঠান মেসার্স ফাল্গুনী এন্টারপ্রাইজও ডিলারশিপ পেয়েছে। রায়পুরের কেরোয়া ইউনিয়নে মেসার্স হাসিনা এন্টারপ্রাইজের মালিক ও উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মেহেদী হাসান আইনানকে মনোনীত করা হয়েছে। বামনী ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আমির হোসেন ওরফে ছুটু। তাদের কয়েকজনের আগে সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা ছিল না বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
উত্তর চর আবাবিল ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মাসুদ মিয়া। চরমোহনা ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি ফাহিম ভূঁইয়া। লক্ষ্মীপুর সদরের দালাল বাজার ইউনিয়নে মেসার্স সততা ট্রেডার্সের মালিক জাকির হোসেন ডিলারশিপ পেয়েছেন। তিনি ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি। তার প্রতিষ্ঠান মূলত রড, সিমেন্ট ও নারকেলের ব্যবসা করে।
রামগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. বিল্লাল পাটোয়ারী। করপাড়া ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আহসান হাবিবের প্রতিষ্ঠান এস বি ট্রেডার্স। ভোলাকোট ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাফেজ আহম্মদ।
কমলনগর উপজেলার সাহেবেরহাট ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন ইয়ামিন ট্রেডার্সের মো. ইসমাইল। তিনি ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক হেলাল উদ্দিনের ভাই। চর মার্টিন ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছেন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব মো. গিয়াস উদ্দিন।
চর ফলকন ইউনিয়নে মনোনীত মাহবুবুর রহমান উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরীর আত্মীয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পাটারীরহাট ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন তার চাচাতো ভাই লোকমান হোসেন পাটারী। হাজিরহাট ইউনিয়নে ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইসমাইল হোসেন। চর কাদিরা ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বোরহান উদ্দিনের ছোট ভাই হেলাল উদ্দিন।
দীর্ঘদিন সার বিক্রি করেও ডিলারশিপ পাননি
চন্দ্রগঞ্জ বাজারে ২০০২ সাল থেকে সার বিক্রি করছেন মো. শোভন। এবার ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেও তিনি মনোনীত হননি। শোভনের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় নিয়ম মেনে আবেদন করার পরও দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা তার কাজে আসেনি।
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সারের ব্যবসা করেও ডিলারশিপ পাইনি। সব নিয়মকানুন মেনে আবেদন করেছি। কিন্তু আমার রাজনৈতিক পরিচয় না থাকায় ডিলার হতে পারলাম না।’
চর কাদিরা ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহেদ হাওলাদারও দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তিনিও ডিলার হওয়ার আবেদন করেছিলেন, কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় তার নাম নেই।
শাহেদ বলেন, ‘নীতিমালায় আগে থেকে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা রয়েছে। আমি এক যুগ ধরে এলাকায় সার বিক্রি করছি। অথচ আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এমন একজনকে ডিলার করা হয়েছে, যিনি আগে কখনো সার ব্যবসা করেননি। বিষয়টি হতাশাজনক।’
কমলনগর উপজেলার চর মার্টিন ইউনিয়নে ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেছিলেন ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবদলের সদস্য তারেক রহমান ওরফে রকি। তার দাবি, তাদের পরিবার প্রায় ৫০ বছর ধরে সার ও কীটনাশকের ব্যবসা করছে। তাদের প্রতিষ্ঠান আগে সার ডিলার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সেই ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ‘যাদের ডিলার করা হয়েছে, তাদের অনেকের গুদাম নেই, সার বিক্রির অভিজ্ঞতাও নেই। অথচ প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হয়েছেন।’ তিনি অভিযোগ করেন, কমলনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরী অর্থের বিনিময়ে ডিলার নিয়োগের ব্যবস্থা করেছেন।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নুরুল হুদা চৌধুরী। তার বক্তব্য, ডিলার নিয়োগে বিএনপি কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। সবাই নিজ নিজ যোগ্যতায় মনোনীত হয়েছেন।
নুরুল হুদা চৌধুরী বলেন, ‘পাটারীরহাট ইউনিয়নের লোকমান হোসেন আমার দূরসম্পর্কের চাচাতো ভাই। চর ফলকন ইউনিয়নের মাহবুবুর রহমানকে আমার ভাগনে বলা হলেও তা সত্য নয়। তিনি আগে ছাত্রদল করতেন, এখন যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদেরও প্রত্যাশা ছিল, নীতিমালা অনুযায়ী আগে থেকে যাঁরা সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তারাই ডিলার নিয়োগে অগ্রাধিকার পাবেন।’
মনোনীতদের দাবি, যোগ্যতা দিয়েই পেয়েছেন ডিলারশিপ
রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিলার নিয়োগের অভিযোগ মানতে নারাজ মনোনীত ব্যক্তিরা। দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের ডিলার আমিনুল আজিজ বাদশা বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নয়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েই তিনি মনোনীত হয়েছেন।
রামগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন ওরফে পলাশের দাবি, ডিলারশিপ পেতে তিনি কোনো রাজনৈতিক তদবির করেননি। বামনী ইউনিয়নের আমির হোসেন ওরফে ছুটু বলেন, আগে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা করলেও এবারই প্রথম সার ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন। নিজের যোগ্যতার ভিত্তিতেই তিনি মনোনীত হয়েছেন বলে দাবি তার।
কমলনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে তাকে মনোনীত করেছে। তবে তিনি আগে কখনো সার ব্যবসা করেননি বলে জানান।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বশিকপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবালের ভাষ্য, তার ইউনিয়নে তিনি ছাড়া অন্য কেউ আবেদন করেননি। এ কারণে সার্বিক বিবেচনায় তাঁকে ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে।
তালিকা চূড়ান্ত করেছে মন্ত্রণালয়
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও জেলা সার এবং বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব জহির আহমেদ বলেন, তালিকায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সংখ্যা বেশি, এমন তথ্য তিনিও পেয়েছেন। তার ভাষ্য, উপজেলা পর্যায়ের সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি আবেদন যাচাই করে সুপারিশসহ তালিকা পাঠিয়েছিল। পরে সেটি কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় যাচাই শেষে চূড়ান্ত তালিকা পাঠিয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. হাছিবুর রহমান বলেন, গত ১৭ বছরে দলের নেতা-কর্মীরা সার ডিলারশিপসহ বিভিন্ন ব্যবসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এখন তারা ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত হতে আবেদন করছেন।
তিনি বলেন, ‘সবাই নিয়ম মেনে আবেদন করেছেন। ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে দলের কোনো প্রভাব ছিল না।’









