৪ হাজার কোটি টাকা জলে, ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি সড়ক নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ হাজার কোটি টাকা জলে, ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি সড়ক নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত
বিআরটির অবকাঠামো সরিয়ে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের করা হবে

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলেছে নির্মাণকাজ, ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি, সঙ্গে ছিল চলাচলে দীর্ঘদিনের জনভোগান্তি। সব মিলিয়ে ঢাকা-গাজীপুর বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পটি যেন সরকার ও জনগণের জন্য গলার কাঁটা। তাই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া প্রকল্পটি নিয়ে এবার ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি সরকার। রাজধানীর বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ি পর্যন্ত অংশের বিআরটির অবকাঠামো সরিয়ে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের করা হবে। এতে বিআরটি প্রকল্পে ব্যয় হওয়া চার হাজার কোটি টাকা অনেকটা জলেই যাচ্ছে।

গত ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরদিন ১৯ অক্টোবর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়।

সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে ১৫ দিনের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতি জানাতে হবে।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সড়কের মাঝে থাকা বিআরটি করিডরের স্টেশন ও লেন বিভাজক সরিয়ে ফেলা হবে। পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় নির্মিত দুটি দুই লেনের ওভারপাস চার লেনে উন্নীত করা হবে। বন্ধ করে দেওয়া হবে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা ঢাকা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি। এর কার্যক্রম নেওয়া হবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতায়।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বিআরটি শাখার উপসচিব তাসলিমা আহমেদ পলির সই করা চিঠিতে বলা হয়েছে, বিআরটি করিডরের স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ করে দুই দিকে তিনটি করে মোট ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তর করা সমীচীন। এ ছাড়া দুটি দুই লেনের ওভারপাস চার লেনে উন্নীত করার কার্যক্রম নেওয়া যেতে পারে।

বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল ঢাকা ও গাজীপুরের মধ্যে দ্রুত বাস চলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্য
বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল ঢাকা ও গাজীপুরের মধ্যে দ্রুত বাস চলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্য

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে বিদ্যমান আইনি জটিলতা নিরসনের মাধ্যমে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করতে হবে। একইসঙ্গে ঢাকা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি বন্ধ করে এর কার্যক্রম সওজের আওতায় আনতে হবে।

মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জরুরি ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে ১৫ দিনের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতি জানাতে হবে।

প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রিতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ব্যয়ও। একপর্যায়ে তা দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকায়, যা প্রাথমিক বরাদ্দের দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২৫ সালে প্রকল্পের ব্যয় আরও বাড়িয়ে ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকার বেশি এবং মেয়াদ ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল।

তবে ১৮ অক্টোবর মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কথা জানালেও বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে কিছু বলেননি।

ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি

গাজীপুরের শিববাড়ি থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রায় ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল ঢাকা ও গাজীপুরের মধ্যে দ্রুত বাস চলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে। ২০১২ সালের নভেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৩৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের মধ্যে কাজ শেষ করে বিআরটি চালুর পরিকল্পনা ছিল।

কিন্তু নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন এবং বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন স্থানান্তরসহ নানা জটিলতায় নির্মাণকাজ পিছিয়ে যায়। ২০১৮ সালে মাঠপর্যায়ে বড় পরিসরে নির্মাণকাজ শুরু হয়।

বর্তমানে করিডরের স্টেশন ও লেন বিভাজক সরিয়ে সাধারণ মহাসড়ক করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় নির্মিত অবকাঠামোর ব্যবহার, অপসারণের ব্যয় এবং প্রকল্পের সামগ্রিক আর্থিক ফলাফল নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রিতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ব্যয়ও। একপর্যায়ে তা দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকায়, যা প্রাথমিক বরাদ্দের দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২৫ সালে প্রকল্পের ব্যয় আরও বাড়িয়ে ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকার বেশি এবং মেয়াদ ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে ওই বছরের ২৭ জুলাই একনেক প্রস্তাবটি অনুমোদন করেনি।

ভোগান্তির পরও মিলল না কাঙ্ক্ষিত সেবা

বিআরটি প্রকল্পের নির্মাণকাজের কারণে গাজীপুর, টঙ্গী ও বিমানবন্দর এলাকার সড়কে দীর্ঘদিন যানজট ও জনভোগান্তি ছিল। প্রকল্পের আওতায় বিআরটি লেন, স্টেশন, উড়ালসড়ক, টঙ্গী সেতু ও বাস ডিপোসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়।

কিন্তু যে উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, সেই দ্রুতগতির বাস চলাচলব্যবস্থা পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে করিডরের স্টেশন ও লেন বিভাজক সরিয়ে সাধারণ মহাসড়ক করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় নির্মিত অবকাঠামোর ব্যবহার, অপসারণের ব্যয় এবং প্রকল্পের সামগ্রিক আর্থিক ফলাফল নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

/জেএ/